মীমাংসিত বিষয়ও ঝুলে আছে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
আমরা বলি, এবং বিশ্বাস করতে ভালোবাসি, রাষ্ট্রীয় প্রশ্নের অনেকগুলোরই মীমাংসা হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে তো হয়নি। হওয়া সহজ নয়। তা ছাড়া হলেও যে মীমাংসা স্থায়ী হবে এমন নয়। রাষ্ট্রের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে কিছু নেই। সমাজের ব্যাপারেও নয়। এটি অনেকটা পারস্পরিক ভালোবাসার মতো; চুক্তি করে হয় না, এবং অলিখিত সম্পর্কটি প্রতিনিয়ত নবায়িত করতে হয়, অনুক্ষণ এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। একবার মন দেওয়া-নেওয়া হয়ে গেছে, কাজেই সম্পর্কটা চিরস্থায়ী হয়ে রইবে, এমন হয় না। অথবা একেবারে উল্টো রকমের উপমা দিয়ে অধিকাংশই ছিল অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণির অন্তর্গত, এখন যায় সব শ্রেণি থেকেই। স্থায়ীভাবে থাকবে বলে শিক্ষিতরা যায়, অতি উচ্চশিক্ষিতরাও যায়, এমন সংখ্যায় আগে যেত না।
বাংলাদেশের যখন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন ছিল তার সামনে। ধারণা করা হয়েছিল, একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে গেছে। আসলে হয়নি। সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে যে নীতিমালা লিখিত হয়েছিল, তাতে এক ধরনের মীমাংসার কথা লেখা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সংবিধানের সেই মূলনীতিগুলোকে বারবার কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। মীমাংসার কথাগুলোকেই বিশেষভাবে।
প্রধান প্রশ্নটি ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে। পাকিস্তান ছিল একটি পুঁজিবাদী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তার ওপরে একটা লেবাস ছিল, সেটা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের। কিন্তু ইসলাম প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আদৌ অনুমোদন করে কি না, সে প্রশ্নটা ইসলামপন্থিরাই তুলেছিল। সব ক্ষমতার উৎস মানুষ, এটা প্রজাতন্ত্রের কথা; ইসলাম তা বিশ্বাস করে না। ইসলাম বিশ্বাস করে সব ক্ষমতার উৎস আল্লাহ। তাই প্রজাতন্ত্রের ধারণাটাই ইসলামবিরোধী। এই তর্ক তখন চালু ছিল। কিন্তু শাসকদের এসব নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না। তারা প্রজাদের খুশি করতে চেয়েছে রাষ্ট্রকে প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা দিয়ে এবং ধার্মিকদের খুশি রাখতে চেয়েছে রাষ্ট্রকে ইসলামি বলে পরিচিত করে। পাকিস্তানি শাসকরা ঠিকই জানত, প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র ছিল পুঁজিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক। ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছিল জনগণকে একদিকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য, অন্যদিকে পশ্চাৎপদ করে রাখার জন্য।
ওই রাষ্ট্র ভেঙে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তাই এই নতুন রাষ্ট্র আর যাই হোক, পুঁজিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক যে হবে না, এটা ধরেই নেওয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে সবাই ছিল, জনগণ ছিল, ছিল উঠতি মধ্যবিত্ত। জনগণ নিশ্চয়ই চায়নি যে একটা পাকিস্তান ভেঙে দুটো পাকিস্তান সৃষ্টি হবে। তারা চেয়েছিল তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র। স্পষ্টভাবে চায়নি। কেননা, জনগণ সচেতন ছিল না; কিন্তু অস্পষ্টভাবে ওই আকাক্সক্ষাটা ছিল। আর জনগণের পক্ষে যে বামশক্তি কাজ করেছিল, তারা এবং বাম বুদ্ধিজীবীরাও দাবি করেছে রাষ্ট্রকে হতে হবে লক্ষ্যের দিক থেকে সমাজতান্ত্রিক, অর্থাৎ পুরোপুরি পুঁজিবাদবিরোধী ও আমলাতন্ত্রবিরোধী। ওই বিরোধিতার অর্থ, বলাই বাহুল্য, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতাও।
জনগণ যা চেয়েছে, উঠতি মধ্যবিত্ত তা চায়নি। তারা চেয়েছে লুটপাট করবে। আগে পাঞ্জাবিরা করেছে, এখন তারা করবে। এই রাষ্ট্র তাদের লুণ্ঠনক্ষেত্র; আগে যেমন ছিল অন্যদের, ভিনদেশিদের। তাদের জন্য স্বাধীনতার অর্থ দাঁড়াল লুণ্ঠনের অবাধ সুযোগ। রাষ্ট্রের চরিত্র তাই বদলাল না। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আবরণটা খসে গেল ঠিকই, কিন্তু ভিতরে বিষয়বস্তু রয়ে গেল আগের মতোই পুঁজিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, আগের মতো নেই। বদল হয়েছে। শেখ মুজিব দ্বিধায় ছিলেন কোন দিকে যাবেন। তিনি সমাজতন্ত্র পছন্দ করতেন। কিন্তু তাকে জাতীয় চরিত্র দিতে চেয়েছিলেন, যেটা আসলে সমাজতন্ত্র নয়, জাতীয়তাবাদই, ভিন্ন নামে। কিন্তু সব দ্বিধার অবসান ঘটল তাঁর মৃত্যুর পরে। তিনি সপরিবার নিহত হলেন সামরিক আমলাতন্ত্রের একাংশের হাতে। তারপরে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল রাষ্ট্রে। যাঁরা এলেন তাঁরা রাষ্ট্রকে পুরোনো ব্যবস্থার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন, সমাজতন্ত্রকে শেষ করে দিলেন ভিতর থেকে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবর্তন ঘটানো হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। এরশাদ ব্যাপারটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন। সময় পেলে হয়তো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ঘোষণাই দিয়ে দিতেন, পাকিস্তানি স্টাইলে।
কিন্তু ইসলামিকরণটা আসল ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপার রাষ্ট্রকে পুঁজিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক করে তোলা। পুরোপুরি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরপরই ‘মুসলিম বাংলা’র সমর্থক বলে পরিচয় দিয়ে ছদ্মবেশী পাকিস্তানমনস্করা আত্মপ্রকাশ করেছিল; তারা বলতে চেয়েছে যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভিতর দিয়ে লাহোর প্রস্তাবই বাস্তবায়িত হয়েছে। সে-বলায় তারা তেমন সাড়া পায়নি। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন ঘটবে এটা কেউ আশা করেনি, এমনকি জামায়াতে ইসলামীও নয়। জামায়াতিরা তাহলে আবার ফেরত এলো কী করে? ফেরত এলো রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে। রাষ্ট্র পুরোনো পথ ধরেছে। তাই পুরোনোরা ফিরে এসেছে, গাড়ি পেছন দিকে ছুটলে পুরোনো স্টেশনগুলো যেমন চলে আসতে থাকে, একের পর এক। ঘটনা এটাই।
হ্যাঁ, জামায়াতে ইসলামী তথা মৌলবাদীদের তৎপরতা এখন অনেক বেড়েছে। তাদের আচরণ এখন ধৃষ্টতাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক। কিন্তু প্রশ্ন হলো কী করে এটা সম্ভব হলো? এ প্রশ্নের তো মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল যে তারা এখানে থাকবে না। তাহলে?
এই আপাত বিস্ময়কর ঘটনার একাধিক কারণ অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু মূল কারণ একটাই। সেটাই হলো রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য। শেখ মুজিবুর রহমান রাজাকারদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তার পরে যত সরকার এসেছে, তাদের প্রত্যেকটিই আগেরটিকে ছাড়িয়ে গেছে, মৌলবাদী, জামায়াত, রাজাকার ইত্যাদির প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শনের ব্যাপারে। এসব সরকারি লোকেরা যে বিশেষভাবে ধর্মপ্রাণ ছিলেন তা নয়। জেনারেল এরশাদ ধর্মের ধার ধারতেন বলে মনে হয় না। তাঁর খ্যাতি ছিল বিপরীত দিকে। সেখানে তিনি পাকিস্তানি জেনারেলদের চেয়ে কম তৎপর ছিলেন না। কিন্তু মৌলবাদীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা ছিল খুবই কার্যকর।
কেন এরা মৌলবাদীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাতে গেলেন? এরশাদ না হয় ছিলেন না, কিন্তু যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাঁরা কেন পক্ষপাতিত্ব দেখালেন।
কারণটা সোজা। কারণটা হলো এই যে এঁরা ধর্মকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, ঠিক সেভাবেই, যেভাবে পাকিস্তানি শাসকরা একসময় ব্যবহার করেছিল। রাষ্ট্রকে এরা পুঁজিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক করে তুলেছেন; কিন্তু সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর একটি আবরণ দিতে চেয়েছেন। এই আবরণটি ধর্মের। এরশাদ আরও এগিয়ে গেলেন। তিনি রাজাকারদের মন্ত্রী করলেন এবং রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তন করলেন, সময় পেলে হয়তো আরও এগোতেন। ধর্মের প্রতি প্রীতির কারণে নয়, নিজেদের স্বার্থে। সেই যে পাকিস্তানি শাসকরা নিজেদের পুঁজিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিকে পাকাপোক্ত করে রাখার অভিপ্রায়ে ধর্মকে ব্যবহার করেছে, বাংলাদেশি শাসকরাও তা-ই করেছে, শেখ মুজিবের পর থেকে। ক্রমাগত। জামায়াতের পুনরায় আবির্ভাবের পেছনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণও রয়েছে। দারিদ্র্য, হতাশা, সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা, সামন্তবাদী ঐতিহ্য, সবকিছুই মৌলবাদকে সমর্থন করে। কিন্তু মূল সমর্থনটা এসেছে রাষ্ট্র থেকেই। রাষ্ট্রীয় সমর্থন ছাড়া মৌলবাদ এতদূর এগোতে পারত না। কিছুতেই নয়।
সবচেয়ে বেশি করেছে এরশাদ সরকার। করেছে দুইভাবে। একটি সুস্পষ্ট, অপরটি প্রচ্ছন্ন। স্পষ্ট দিক থেকে মৌলবাদী সাংস্কৃতিক প্রবণতাকে উৎসাহ দান, রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তন সবকিছুই মৌলবাদের পক্ষে গেছে। এরশাদ আবার প্রচ্ছন্নভাবেও মৌলবাদকে উৎসাহিত করেছেন। তিনি স্বৈরাচার কায়েম করেছিলেন। এর বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছে, তাতে জামায়াতও যোগ দিয়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি থেকেছে, নিজে অগণতান্ত্রিক হয়েও। এরশাদের সঙ্গে জামায়াতের অবৈরী দ্বন্দ্ব, জামায়াত এটিকে বৈরী দ্বন্দ্বের চেহারা দিয়ে জনসমর্থন অর্জন করেছে। বোঝাতে চেয়েছে, সে-ও স্বৈরাচারবিরোধী। এরশাদ তাই প্রত্যক্ষরূপে সাহায্য করলেন পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে এবং অপ্রত্যক্ষরূপে সাহায্য করলেন গণবিরোধিতার ভিতর দিয়ে।
♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
