যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার নিয়ে বিরোধ, চীন গড়ছে দ্রুতগতিতে

অনলাইন ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র যখন ডেটা সেন্টার নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, তখন চীন দ্রুতগতিতে গড়ে তুলছে বিশাল বিশাল ডেটা সেন্টার। দেশটির বিস্তীর্ণ গ্রামীণ অঞ্চলে একের পর এক তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক কম্পিউটিং অবকাঠামো। সস্তা জমি, বিপুল পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে বেইজিং।

চীনের অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া অঞ্চলের উলানচাব শহর এ উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। গোবি মরুভূমির প্রান্তবর্তী এ শহরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে নতুন ও নির্মাণাধীন ডেটা সেন্টারগুলো একের পর এক মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।

সূর্যমুখী ও জোয়ারের ক্ষেতের মাঝখানে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনার গায়ে দেখা যাচ্ছে চীনের প্রযুক্তি খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নাম। এর মধ্যে রয়েছে হার্ডওয়্যার নির্মাতা হুয়াওয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম কুয়াইশো এবং ডেটা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ভিএনইটি।

দুই মিলিয়নেরও কম জনসংখ্যার এই শহরে প্রায় ৯০টি ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো চালু হলে চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত এআই অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে উলানচাব।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এআই প্রতিযোগিতায় চীনের বড় শক্তি দ্রুত নির্মাণ
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে এআই ডেটা সেন্টারের সংখ্যা ছিল চীনের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ। কম্পিউটিং সক্ষমতার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের এগিয়ে থাকার বিষয়টি বিভিন্ন হিসাব-নিকাশে উঠে এসেছে।

এছাড়া উন্নত এআই চিপের সহজলভ্যতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় সুবিধা। এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য এসব চিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনভিডিয়া ও এএমডির মতো প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে উন্নত কিছু চিপে প্রবেশাধিকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

অন্যদিকে, মার্কিন রফতানি নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত এআই চিপ সংগ্রহে বাধার মুখে রয়েছে। চীনের নিজস্ব চিপ নির্মাতারা প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করলেও তাদের উন্নত মডেলগুলোর সক্ষমতা এখনও মার্কিন প্রযুক্তির সমপর্যায়ে পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে এসব চিপের সরবরাহও সীমিত।

তবে চিপ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও অন্য কিছু সুবিধা কাজে লাগিয়ে ব্যবধান কমাতে চাইছে চীন। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা, তুলনামূলক সস্তা জমি এবং বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামর্থ্য।

উলানচাবের বায়িন বিগ ডেটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক এরই একটি উদাহরণ। পার্কটির ঘনবসতিপূর্ণ ডেটা সেন্টার এলাকাটির বড় অংশ মাত্র দুই বছরে গড়ে উঠেছে। এত অল্প সময়ে এত বড় অবকাঠামো নির্মাণ চীনের দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতারই পরিচয় দিচ্ছে।

ডেটা সেন্টার ঘিরে বাড়ছে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড
উলানচাবের বায়িন শিল্পাঞ্চলে এক কর্মদিবসে নির্মাণকাজের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্মাণস্থলে প্রবেশের আগে শ্রমিকদের মুখমণ্ডল স্ক্যান করা হচ্ছিল। নিরাপত্তারক্ষীদের তল্লাশি পেরিয়ে কর্মীরা ভেতরে ঢুকছিলেন। অন্যদিকে, ট্রাকভর্তি নির্মাণসামগ্রী নিয়ে একের পর এক যানবাহন প্রবেশ করছিল বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায়।

নির্মাণস্থলের বাইরে অস্থায়ী দোকানে নুডলস, সিগারেটসহ নানা পণ্য বিক্রি করছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাদের অনেকের জন্য ডেটা সেন্টার নির্মাণ নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। আগে যে অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর ছিল, সেখানে এখন নির্মাণশ্রমিক ও প্রকৌশলীদের আনাগোনায় ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়েছে।

এলাকাটিতে গত ৩০ বছর ধরে মুদি দোকান ও অতিথিশালা পরিচালনা করছেন ৫৬ বছর বয়সী মা রং। সিএনএনকে তিনি বলেন, আগে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকতে হতো। এখন সারাক্ষণ অর্ডার সামলাতে হয়, নানা কাজ করতে হয়; বিশ্রামেরও তেমন সুযোগ নেই। আগের তুলনায় তার ব্যবসা অনেক ভালো হয়েছে।

তবে উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে কিছু মানুষকে স্থানও পরিবর্তন করতে হয়েছে। ৫৮ বছর বয়সী রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী লিউ বাওপিং জানান, মহাসড়ক ভেঙে নতুন করে নির্মাণের কারণে তাকে আগের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরে যেতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও ডেটা সেন্টার নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে তার রেস্তোরাঁয় প্রতিদিনের ক্রেতার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

লিউ বলেন, পরিবেশ আগের মতো পরিচ্ছন্ন নেই। তবে মানুষের আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে।

অর্থাৎ, ডেটা সেন্টার নির্মাণ শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে না; এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও।

এআইকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি করতে চায় বেইজিং
চীনের অর্থনীতি যখন মন্থর প্রবৃদ্ধি এবং জনসংখ্যা হ্রাসের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হিসেবে দেখছে দেশটির সরকার।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত জুলাইয়ে সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে বলেন, চীন এআই প্রযুক্তিকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে গৃহস্থালির পণ্য- বিভিন্ন খাতে এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদনশিল্পে এআই সংযুক্ত করার প্রচেষ্টাকে তিনি চীনের আধুনিকায়নের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরেন।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনে ইতোমধ্যে ৭০ কোটির বেশি মানুষ এআই ব্যবহার করছেন। উৎপাদন, শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হলে বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন। সেই চাহিদা পূরণেই ডেটা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে সরকার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে বেইজিং আগামী পাঁচ বছরে কম্পিউটিং সুবিধাসহ তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো সম্প্রসারণে ৫৬ হাজার কোটি ডলারের একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোডিয়াম গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানিগুলোর এ খাতে বিনিয়োগ চলতি বছর দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ১৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।

তবে এই অঙ্ক যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। একই খাতে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ প্রায় ৮০ হাজার কোটি ডলার হতে পারে, যা চীনা কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য বিনিয়োগের পাঁচ গুণেরও বেশি।

চীনের সুবিধা সস্তা ও প্রচুর নবায়নযোগ্য জ্বালানি
ডেটা সেন্টার পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এআই মডেল প্রশিক্ষণ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং ব্যবহারকারীদের প্রশ্নের উত্তর তৈরিতে হাজার হাজার সার্ভার একসঙ্গে কাজ করে। ফলে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এআই অবকাঠামোর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

যুক্তরাষ্ট্রে পুরোনো বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে। কয়েক দশক ধরে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সম্প্রসারণ তুলনামূলক ধীরগতিতে হওয়ায় নতুন ডেটা সেন্টারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে, চীন ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যে পরিমাণ নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করেছে, তা ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সমপরিমাণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপুল উৎপাদন। দেশটিতে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও উৎপাদিত বিদ্যুতের সবটুকু ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ক্লিন এনার্জি অ্যান্ড এয়ার রিসার্চ সেন্টার এবং গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনে অব্যবহৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ এত বেশি ছিল যে তা দিয়ে মেক্সিকোর পুরো এক বছরের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব হতো।

এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কাজে লাগানোর পাশাপাশি সবুজ প্রযুক্তি খাতের ব্যবসা বাড়াতে চাইছে বেইজিং। এ লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে ‘ইস্টার্ন ডেটা, ওয়েস্টার্ন কম্পিউট’ বা ‘পূর্বের তথ্য, পশ্চিমের কম্পিউটিং’ কৌশল।

২০২২ সালে চালু হওয়া এই পরিকল্পনার আওতায় চীন আটটি জাতীয় কম্পিউটিং হাব এবং ১০টি জাতীয় ডেটা সেন্টার ক্লাস্টার নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে জমি বিস্তৃত, সূর্যালোক ও বাতাসের প্রাপ্যতা বেশি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য, পূর্বাঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্পসমৃদ্ধ এলাকায় সৃষ্ট তথ্য প্রক্রিয়াকরণের চাহিদার একটি অংশ পশ্চিমাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া। এতে একদিকে পূর্বাঞ্চলের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের অব্যবহৃত বিদ্যুৎ কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক কাইল চ্যানের মতে, জ্বালানি অবকাঠামো দ্রুত নির্মাণের ক্ষেত্রে চীনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণের এ ধরনের বড় উদ্যোগ না থাকায় সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিড সংযোগের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

চীনের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনাতেও কম্পিউটিং অবকাঠামো ও সবুজ জ্বালানির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উন্নত চিপের ঘাটতি মেটাতে নতুন উদ্যোগ
বিদ্যুতের প্রাচুর্য চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত চিপের ঘাটতি মোকাবিলায় কিছুটা সহায়তা করছে।
হুয়াওয়ের মতো চীনা প্রতিষ্ঠান একাধিক চিপকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে তুলনামূলক কম শক্তিশালী চিপ থেকেও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করছে। নির্দিষ্ট কিছু কাজে এ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

তবে এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একই কাজ সম্পন্ন করতে বেশি চিপ ব্যবহার করলে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে উন্নত চিপের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে পরিচালন ব্যয় ও জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়তে পারে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক নিক করভিনো বলেন, একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের সামগ্রিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে চিপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় চিপের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই।

এছাড়া পশ্চিমাঞ্চলে নির্মিত সব ডেটা সেন্টার সমানভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পূর্বাঞ্চলের বড় শহরগুলোতে যেসব কাজে তাৎক্ষণিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে দূরবর্তী ডেটা সেন্টার থেকে দ্রুত সেবা দেওয়া কঠিন হতে পারে।

কিছু প্রকল্পকে ‘ঘোস্ট ডেটা সেন্টার’ বা কার্যত ব্যবহারকারীহীন ডেটা সেন্টারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও উদ্বেগ আছে। অর্থাৎ, সরকারি পরিকল্পনা পূরণের লক্ষ্য নিয়ে গ্রামীণ এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও সেখানে পর্যাপ্ত সার্ভার, উন্নত চিপ কিংবা গ্রাহকের চাহিদা না থাকলে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যাবে না।

তবে অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়ার উলানচাবের মতো কেন্দ্রগুলোতে পরিস্থিতি তুলনামূলক আশাব্যঞ্জক। সেখান থেকে প্রায় ২০০ মাইল দূরের বেইজিংয়ে অপটিক্যাল কেবলের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তথ্য পাঠানো সম্ভব। পাশাপাশি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগও এসব প্রকল্পের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।

বিদ্যুতের বড় অংশ আসবে সরাসরি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে
একসময় চীনের অন্যতম প্রধান কয়লা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বিস্তীর্ণ এলাকায় সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানো হয়েছে। খোলা প্রান্তরে ঘুরছে বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন। কোথাও কোথাও মহাসড়কের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায় অব্যবহৃত টারবাইন ব্লেড।

উলানচাব চীনের ১০টি জাতীয় ডেটা সেন্টার ক্লাস্টারের একটি এলাকার মধ্যে পড়েছে। শহরটির বিদ্যুৎ গ্রিডের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ আসে বায়ু ও সৌরশক্তি থেকে। কিছু প্রতিষ্ঠান আরও বেশি পরিমাণে সরাসরি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের ব্যবস্থা করছে।

এমন একটি প্রকল্প হলো এনভিশনের ‘গ্যালাক্সি ক্যাম্পাস’। উলানচাবের বায়িন শিল্পাঞ্চলের কয়েক মাইল দূরে নির্মাণাধীন এই ডেটা সেন্টারটি আয়তনে ২০টিরও বেশি ফুটবল মাঠের সমান। নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের বৃহত্তম ডেটা সেন্টারগুলোর একটি হতে পারে।

এখানে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সার্ভার ও চিপ স্থাপন করা হবে। এসব সার্ভার বেইজিংয়ের মতো শহরের এআই অ্যাপ ব্যবহারকারীদের প্রশ্নের উত্তর তৈরি করা এবং অন্যান্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ করবে।

এনভিশনের দাবি, প্রকল্পটির বিদ্যুতের ৮০ শতাংশের বেশি সরাসরি তাদের পরিচালিত বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা হবে। অর্থাৎ, বিদ্যুতের এই অংশ জাতীয় গ্রিডের মধ্য দিয়ে না এনে সরাসরি ডেটা সেন্টারে পৌঁছে দেওয়া হবে।

প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক রিকি ঝেং জানান, ব্যাটারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বায়ুবিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি অত্যাধুনিক সলিড-স্টেট ট্রান্সফরমার ব্যবহার করে সার্ভারের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত সমন্বয় করা সম্ভব হবে।

এ ধরনের ব্যবস্থা বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়াতে পারে।

পানি ব্যবহারের চাপ কমানোর উদ্যোগ
ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কের অন্যতম কারণ হলো বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার। সার্ভার ঠান্ডা রাখতে অনেক ক্ষেত্রে বড় আকারের শীতলীকরণব্যবস্থা প্রয়োজন হয়, যার জন্য প্রচুর পানি ব্যয় হতে পারে।

তবে রিকি ঝেংয়ের দাবি, উলানচাবের শীতল আবহাওয়ার কারণে এখানে ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে তুলনামূলক কম শক্তি প্রয়োজন হয়। এছাড়া এনভিশনের প্রকল্পে ‘জিরো-ওয়াটার’ বা পানি ব্যবহার না করার একটি বিশেষ শীতলীকরণব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ব্যবস্থায় শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত অ্যালকোহলভিত্তিক তরলকে শীতলীকরণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ফলে প্রচলিত পানি-নির্ভর শীতলীকরণব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

তবে এ ধরনের ব্যবস্থার প্রকৃত পরিবেশগত সুবিধা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পুরো পরিচালনপ্রক্রিয়া, জ্বালানি ব্যবহার এবং শীতলীকরণ উপাদানের ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

নির্মাণ শুরুর আগেই বুকিং শেষ
এনভিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগামী বছরগুলোতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় ডেটা সেন্টারের চাহিদাও বাড়বে।

রিকি ঝেং জানান, তাদের পরিকল্পিত দুই গিগাওয়াট সক্ষমতার পুরো প্রকল্পের প্রথম ধাপের জায়গা ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ বুক হয়ে গেছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি এআই ও ক্লাউড সেবার জন্য আরও কয়েকটি ধাপের নির্মাণকাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

তার মতে, ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় এআই চিপ ও সার্ভারের মালিক হবেন তাদের গ্রাহক প্রতিষ্ঠানগুলো। এত বড় প্রকল্প নির্মাণের নির্দেশ দেওয়ার আগে গ্রাহকেরা সার্ভার র‌্যাক পূরণ করার মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো সংগ্রহের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটি আগামী এক দশকের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামোর নকশা করেছে বলেও জানান তিনি।

ঝেং বলেন, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

এআই আধিপত্যের লড়াইয়ে চীনের কৌশল কতটা সফল হবে?
এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চীনের সামনে এখনও বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। উন্নত চিপের সীমিত সরবরাহ, মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতার সমস্যা এবং বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেশটির অগ্রগতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে চীন যে গতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রযুক্তি অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করছে, তা দেশটির জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধা তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতা, জমির ব্যবহার, পানি সরবরাহ এবং স্থানীয় জনগণের আপত্তির মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চীনে অবশ্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় বিরোধিতা তুলনামূলক কম দৃশ্যমান।

উলানচাবের স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে এসব প্রকল্পের ফলে ব্যবসা ও আয় বাড়ার কথা বলছেন। অন্যদিকে, উন্নয়নের কারণে পরিবেশগত পরিবর্তন এবং কিছু মানুষের স্থানচ্যুতির বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তাই বলা যায়, চীন শুধু এআই প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে না; সেই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, জমি, সার্ভার ও তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামোও দ্রুত গড়ে তুলছে। উন্নত চিপের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও অবকাঠামো নির্মাণ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নিজেদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে দেশটি।

উলানচাবের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে গড়ে ওঠা ডেটা সেন্টারগুলো সেই কৌশলেরই প্রতিফলন। তবে এই বিপুল অবকাঠামো শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হবে এবং চীনের এআই প্রযুক্তি কতটা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করবে উন্নত চিপের প্রাপ্যতা, বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার, প্রকৃত বাজারচাহিদা এবং বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করার ওপর। সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights