ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল: ভয়াবহ ধোঁয়াশা থেকে বাঁচতে ছেটানো হচ্ছে ড্রাই আইস

অনলাইন ডেস্ক

ইন্দোনেশিয়া জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দাবানল থেকে উৎপন্ন মারাত্মক বিষাক্ত ধোঁয়াশা কেবল দেশটিতেই নয় বরং সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। বহু চেষ্টা, মেঘ সৃষ্টি করে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো কিংবা আকাশপথে বিপুল পরিমাণ পানি ঢালার মতো চিরাচরিত পদ্ধতি প্রয়োগ সত্ত্বেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন না হওয়ায়, ইন্দোনেশিয়া সরকার এবার ধোঁয়াশার হাত থেকে রক্ষা পেতে এক নতুন ও ব্যতিক্রমী কৌশল গ্রহণ করেছে। দাবানলের উৎস ও ধোঁয়াশার বিস্তৃতি কমাতে প্রদেশজুড়ে বিমানে করে শক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ছেটানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এই বিশেষ পাইলট প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণ সুমাত্রা প্রদেশে পরীক্ষামূলকভাবে শুষ্ক বরফ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্টেট নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির সমন্বয়ক নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী দুদং আবদুর রহমান জানিয়েছেন যে, সরাসরি রাষ্ট্রপতির বিশেষ নির্দেশে সুমাত্রার ধোঁয়াশা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ড্রাই আইস ছিটানোর এই পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা ও ফলাফল খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি এতে ইতিবাচক সাফল্য আসে, তবে দেশের অন্যান্য দাবানলকবলিত ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন অঞ্চলেও একই পদ্ধতি প্রয়োগের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত সমগ্র ইন্দোনেশিয়া জুড়ে প্রায় ৯ লক্ষ হেক্টর বনভূমি ও অঞ্চল দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। যা বিগত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার জলবায়ুর ওপর ‘গডজিলা’ বা অতি শক্তিশালী এল-নিনোর নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত প্রবল ছিল। অন্যদিকে পাম অয়েলের মতো অর্থকরী ফসল চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করতে যে ঐতিহ্যবাহী ও ক্ষতিকর বন কেটে আগুন লাগানোর চর্চা অব্যাহত রয়েছে, তা এ বছর দাবানলকে অনিয়ন্ত্রিত রূপ দিতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

বিগত কয়েক মাস ধরে ইন্দোনেশিয়ার লাখ লাখ মানুষ ঘন ধোঁয়া ও এক ধরনের রুদ্ধশ্বাস কমলা রঙের বিষাক্ত ধোঁয়াশার চাদরে বন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনগণের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের এহেন অবহেলার অভিযোগে গত সপ্তাহে দেশটির আদালতে একটি গণস্বার্থ মামলাও দায়ের করা হয়েছে, যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে চরম গাফিলতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিষাক্ত বায়ুর কারণে সৃষ্টি হওয়া বিভিন্ন মারাত্মক শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা ও অসুস্থতার চিকিৎসায় ইতিমধ্যে দশ হাজারের বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে গিয়েছেন।

ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকট এখন সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও তীব্র আকারে দেখা দিয়েছে। পার্শ্ববর্তী মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ফিলিপাইন পর্যন্ত এই ধোঁয়াশার বিস্তার ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় তিমুর-লেস্তে প্রশাসন সারা দেশে তিন দিনের জন্য সব স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করেছে। শিশুদের ঘরের ভেতরে আবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি একান্ত প্রয়োজনে বাইরে বের হলে ফেস মাস্ক বা শ্বাসপ্রশ্বাসের সুরক্ষামূলক সামগ্রী ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে তিমুর-লেস্তে সরকার।

অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর সরকারও এই সংকটে সাধারণ নাগরিকদের পাশে দাঁড়াতে ধোঁয়াশা সংক্রান্ত চিকিৎসার জন্য বিশেষ সরকারি ভর্তুকি ঘোষণা করেছে। এর আগে ২০১৫ সালের ভয়াবহ ধোঁয়াশার সময় সিঙ্গাপুর সরকার শেষবার এ ধরনের চিকিৎসার জন্য ভর্তুকি প্রদান করেছিল। শুধু তাই নয়, সিঙ্গাপুরজুড়ে দুস্থ ও যোগ্য বাসিন্দাদের কাছে এন-৯৫ মাস্ক বিতরণ শুরু করা হয়েছে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে সম্প্রতি বিশ্বসেরা দূষিত শহরের তালিকায় উঠে এসেছে সিঙ্গাপুরের নাম, আর তার ঠিক পেছনে দ্বিতীয় অবস্থানে অবস্থান করছে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর।

কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবারে একটি সেসনা বিমানযোগে সুমাত্রার বাণিজ্যিক কেন্দ্র পালেমবাং শহরের আকাশে প্রায় ১.৫ টন ড্রাই আইস ছেটানো শুরু হয়েছে। ইন্দোনেশীয় প্রশাসনের প্রত্যাশা, এই ড্রাই আইস ধোঁয়ার ঘনত্ব কমিয়ে দেবে এবং বায়ুমান ও দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে। ১৯৪০-এর দশকে মেঘে বরফের কণা বা মেঘ পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে প্রথম এই ড্রাই আইসের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ও দাবানল বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের কৌশলের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলসের (ইউএনএসডাব্লিউ) বুশফায়ার রিসার্চ গ্রুপের অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর রিক ম্যাকরে বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানের দিক তুলে ধরে বলেন যে, ড্রাই আইস ব্যবহার করে সাময়িক এবং অত্যন্ত স্থানীয় একটি সমাধান বা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আবহাওয়া ও বায়ুর গতি সর্বদা পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ধাবিত হয়। তাই কোনো শহরের ওপর আকাশ সাময়িকভাবে ধোঁয়ামুক্ত করা হলেও চারপাশ থেকে ক্রমাগত নতুন ধোঁয়া উড়ে এসে সেই স্থান পুনরায় দখল করবে। ফলে এটি কোনো সহজ বা স্থায়ী সমাধান হতে পারে না, কারণ বায়ুর প্রবাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে।

ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় কালিমন্তন প্রদেশে বুধবারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানকার স্ট্যান্ডার্ড বায়ুদূষণ সূচক ১২০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা বিপদসীমা অর্থাৎ ৩০০ পয়েন্টের চেয়ে চার গুণ বেশি ভয়াবহ। অতিরিক্ত ধোঁয়াশার কারণে প্রাদেশিক শহর পালংকারায়ার দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নেমে আসে, যার ফলে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। স্থানীয় পরিবেশ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করায় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো অবিলম্বে ফায়ারফাইটিং কার্যক্রম জোরদার করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন এবং অবৈধভাবে আগুন লাগানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ জারি করেছেন।

তবে ইন্দোনেশিয়া সরকারের জন্য এই আগুন নেভানো অত্যন্ত জটিল এক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। দেশটির অধিকাংশ এলাকাজুড়ে রয়েছে গভীর পিট কয়লা সমৃদ্ধ ভূগর্ভস্থ বনভূমি। পিটল্যান্ডের ভেতরের কাঠ ও পচাপাতা বছরের পর বছর ধরে মাটির নিচে শুকিয়ে গিয়ে এমনভাবে অবস্থান করে যে সেখানে লাগা আগুন মাটির কয়েক ফুট নিচ দিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ জ্বলতে থাকে, যা সাধারণ পানি ছিটিয়ে কিংবা ওপর থেকে আগুন নিভিয়ে পুরোপুরি দমন করা অত্যন্ত কঠিন।

সমগ্র অঞ্চলের এই সার্বিক সংকট নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট টেনে গবেষক রিক ম্যাকরে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, সময় যত গড়াচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন যত প্রবল হচ্ছে, এই ধরণের দাবানল ও ধোঁয়াশা কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের জাতীয় সমস্যা হয়ে থাকবে না বরং এটি অত্যন্ত দ্রুত একটি গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হতে যাচ্ছে। কারণ বায়ুমণ্ডল এবং পৃথিবীর সার্বিক বাস্তুতন্ত্র একক সুতোয় গাঁথা ও আন্তঃসংযুক্ত।

সূত্র: গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights