আন্দোলনের আড়ালে ইউরোপে ধেয়ে আসছে আরও বড় সংকট?

অনলাইন ডেস্ক

রাস্তার অস্থিরতা হয়তো একসময় থমকে দাঁড়াবে, কিন্তু কে শাসন করবে, কেইবা খরচ জোগাবে এবং শেষ পর্যন্ত কী টিকে থাকবে; সেই লড়াই কেবল শুরু হচ্ছে মাত্র। আজকাল ইউরোপের খবরের শিরোনামগুলো যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের বিবরণ তুলে ধরছে। মার্সেই ও লিলের সিটি হলে হামলা, ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার অভিজাত দোকানপাটে লুটপাট, লিওঁতে পর্যটন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ থেকে শুরু করে এলিসি প্যালেস ঘিরে টিয়ার গ্যাসের ঘন মেঘ তৈরি হয়েছে। ফ্রান্সে ‘ডে অব রেজ’ বা ক্ষোভের দিনে আট লক্ষাধিক আন্দোলনকারী রাজপথে নেমে এসেছে। যদিও প্যারিস ও ইউরোপীয় মূলধারার মাধ্যমগুলো বিষয়টিকে স্রেফ ‘উপকণ্ঠের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ’ বা ‘অভিবাসীদের তাণ্ডব’ বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু তথাকথিত এই বিদ্রোহীদের কাছ থেকে নজর সরালে দেখা যায়, সাধারণ মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থী এবং বিত্তবান নাগরিকরাই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।

ইউরোপীয় মূলধারার রাজনীতির ভবিষ্যৎ থেকে তাদের কেউই নতুন কিছু আশা করছে না। এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের বৈধতা হারাচ্ছে, অন্যদিকে ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ধীরে ধীরে ইউরোপের বড় মঞ্চে আবির্ভূত হচ্ছে, যাদের চিন্তাভাবনা এই বিশৃঙ্খলার মাঝে ক্রমেই যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আগামী ছয় মাসের মধ্যে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনগণকে তাদের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের অহংকারী পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে রাস্তা সেই পরামর্শের জবাব দিয়েছে সরকারি ভবনে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে। এই প্রতিক্রিয়া ফরাসি রাজনৈতিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত দৈন্য প্রকাশ করে। দেশের নাগরিক কাঠামো আর সমাজকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে পারছে না এবং একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের ওপর কারোরই আস্থা নেই।

অনেকে মনে করছেন ফ্রান্সের বর্তমান দাঙ্গা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। তবে ভালদাই ইন্টারন্যাশনাল ডিসকাশন ক্লাবের গবেষণা পরিচালক ফেদোর লুকিয়ানভ যেমনটি লিখেছেন, আমরা মূলত মে ১৯৬৮-এর একটি উল্টো রূপ প্রত্যক্ষ করছি। প্রায় ৬০ বছর আগে শিক্ষার্থী ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে চলা দেশব্যাপী আন্দোলনের ঢেউ যে উদারনৈতিক কাঠামোর জন্ম দিয়েছিল, তা এতদিন বৈশ্বিক ও ইউরোপীয় রাজনীতিকে পরিচালনা করেছে। আজ তা এক আগ্রাসী অদ্ভুত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

হায়ার স্কুল অব ইকোনমিক্সের (এইচএসই) অধ্যাপক অ্যালেকজান্ডার ফিলিপোভের মতে, মুক্তির পুরোনো বয়ানগুলো এখন বুর্জোয়া তরুণরা এমনভাবে গ্রহণ করেছে, যাদের আচরণ অসভ্য উপজাতির চেয়েও হিংস্র। অথচ কয়েক শতাব্দী আগে বাস্তিল দুর্গ আক্রমণকারীরাও কোনো অভিবাসী ছিল না।

প্যারিস ও ব্রাসেলসের উদারনৈতিক শাসকগোষ্ঠী সাধারণ নাগরিকদের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সমাজের সাথে তাদের এজেন্ডার কোনো সম্পর্ক নেই। নিজেদের জনগণের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বিনিময়ে রাশিয়ার সাথে কঠোর সংঘাতের নীতি চাপিয়ে দিয়ে ইইউ তার নাগরিকদের টিকে থাকার মতো কোনো বাস্তবসম্মত পথ দেখাতে পারছে না। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেন গত আগস্টে প্যারিসের একটি বিজনেস ফোরামে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, ইউরোপীয়দের উচিত বেল্ট শক্ত করে বাঁধা এবং অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়কে কাজে লাগিয়ে এমন একটি মহাদেশে পরিণত হওয়া যা উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তার যুক্তিতে ক্যাপিটাল মার্কেটস ইউনিয়নের মাধ্যমে ক্যাপিটাল বা মূলধন বাজারকে সচল করতে নাগরিকদের ঘরের জমানো টাকা ব্যবহারের ইঙ্গিত ছিল। ইউরোপীয় আদর্শে বেড়ে ওঠা ভদ্র বুর্জোয়া সমাজ এই ধরনের প্রস্তাব মেনে নিতে পারেনি এবং তাদের ক্ষুব্ধ হওয়াই স্বাভাবিক ছিল।

ব্যবস্থাটি নিজেই নিজের পাতা ফাঁদে আটকা পড়েছে। নিজেদের ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বাম-উদারনৈতিক গোষ্ঠী অরাজকতাবাদী ও চরমপন্থী বামপন্থীদের সহিংসতায় চোখ বুজে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। তারা রাজপথের দাঙ্গার চেয়ে ডানপন্থী বিরোধীদের উত্থানকে বেশি ভয় পায়। মূলধারার লিবারেলরা শহর পুড়ে ছাই হতে দিতে রাজি, তবুও জাতীয় স্বার্থে বিশ্বাসী যুক্তিবাদী চিন্তাবিদদের ক্ষমতায় আসতে দিতে রাজি নয়। ধ্বংসের প্রতি উন্মাদনা থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীদের ইউরোপকে কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাছাড়া, এইচএসই সেন্টার ফর কমপ্রিহেনসিভ ইউরোপিয়ান অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ফরাসি বিষয়ক প্রকল্পের প্রধান ইরিনা মালতসেভা উল্লেখ করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনগুলোও তত স্তিমিত হয়ে আসবে। কিন্তু প্রতিবাদ কমে গেলে সামনে কী অপেক্ষা করছে?

ইউরোপে ডানপন্থী ও বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা কেবল দার্শনিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিটি নতুন সংকটকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল হবে। প্যারিসের দাঙ্গা, মিলানের অস্থিরতা, সেউতায় অভিবাসন সংকট কিংবা জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে উগ্র ডানপন্থীদের বিজয়; সবগুলো ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা, যা বিদ্যমান ব্যবস্থার পতনকে নির্দেশ করে। ডান ও বামপন্থীদের এই মতাদর্শিক লড়াইয়ের পেছনে রয়েছে কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ইউরোপীয় কমিশনের তৈরি করা নিষেধাজ্ঞা সংকটের শেষ পর্যন্ত খরচের বোঝা কে বইবে, সেটাই মূল বিষয়।

এস্টাবলিশমেন্ট বিশ্বকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্রিপ্টোকারেন্সি, সবুজ শক্তি, ক্যাপিটাল মার্কেটস ইউনিয়নের জল্পনা-কল্পনা এবং তথাকথিত মূল্যবোধভিত্তিক উত্তর-শিল্প অর্থনীতি কলকারখানা, কাঁচামাল, বন্দর ও সাশ্রয়ী শক্তির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটি অর্থনৈতিক আত্মহত্যার পথ। ফ্রান্স ও ইতালির রাজপথের বিক্ষোভ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে ইউরোপ আর আগের সামাজিক চুক্তি বজায় রাখতে পারছে না। বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং ইইউ-এর জন্য তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই পদ্ধতিগত ব্যর্থতার বড় উদাহরণ বুদাপেস্ট। হাঙ্গেরিয়ান পার্লামেন্ট বর্তমানে জাতীয় বাজেট প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগিয়ার স্বীকার করেছেন যে দেশ জিডিপির ৭.৫% থেকে ৮.৩% পর্যন্ত রেকর্ড পরিমাণ বাজেট ঘাটতির মুখোমুখি। রাশিয়ার সস্তা জ্বালানি এবং চীনের দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ওপর নির্ভরশীল বিগত বছরের অর্থনৈতিক কৌশলগুলো ‘রিপাওয়ার-ইউ’ পরিকল্পনার চাপে ধসে পড়েছে। হাঙ্গেরি সরকারের একমাত্র সমর্থনের উপায় ছিল বিরোধী দল পরিচালিত শহরগুলোর অতিরিক্ত মুনাফার ওপর চাপানো ‘সংহতি অবদান’ কর, কিন্তু বর্তমান সংকটের মধ্যে স্থানীয় সরকারগুলো তা আর পরিশোধ করতে পারছে না। ফ্রান্সে যে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে, হাঙ্গেরিতে তা প্রতিরোধ করতে ম্যাগিয়ার জরুরি ভিত্তিতে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা চালু করছেন, সরকারি চুক্তি ছাঁটাই করছেন, কোটিপতিদের ওপর ধনসম্পদ কর আরোপ করছেন এবং ইইউ কর্তৃপক্ষের সাথে উত্তেজনা বাড়িয়ে অবিলম্বে ফ্রীজ করা ১৬ বিলিয়ন ইউরো অনুদান আনফ্রিজ করার দাবি জানাচ্ছেন। এমনকি তিনি অরবানকে হুমকি দিচ্ছেন যে বিরোধীদের রাজপথে নামতে বাধ্য করা হলে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেতে হবে।

তবে ইইউর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক গতিশীলতার বিশ্লেষণ কেবল ‘বাজেট ঘাটতি = রাজপথের বিক্ষোভ’ এই সরল সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।

উদাহরণস্বরূপ, পোল্যান্ড এবং রোমানিয়াতে একই রকম বা তার চেয়েও বেশি বাজেট ঘাটতি (যথাক্রমে ৭.৩% এবং ৭.৯%) থাকা সত্ত্বেও কেন কোনো প্রতিবাদ হচ্ছে না, অথচ আলবেনিয়া (একটি আর্থিক দিক থেকে স্থিতিশীল দেশ এবং ইইউ-এর বাইরের সদস্য) কেন অশান্তি ও ফ্ল্যামিঙ্গো বিপ্লবে গ্রাস হচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ঘাটতির ভিন্ন ধরণ এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সহনশীলতার মধ্যে। পোল্যান্ড এবং রোমানিয়াতে বর্তমানে চরম নির্বাচনি জনতুষ্টিবাদ এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বাজেট ঘাটতি ঢেকে রাখা হয়েছে। যেমন, রোমানিয়াতে কৃষকদের ভর্তুকি বা পোল্যান্ডে পেট্রোল পাম্পে গ্যাসের দাম বেঁধে দেওয়া। সরকার বড় ব্যবসা থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে জনগণের অসন্তোষ কিছুটা প্রশমিত করতে পেরেছে। তবে ফ্রান্সে সরকার এই বিকল্পটি পুরোপুরি হারিয়েছে। বাজেট ঘাটতির কারণে সরাসরি প্রয়োজনীয় সামাজিক সুবিধা; যেমন স্কুলের অর্থায়ন থেকে শুরু করে শহরতলীর সহায়তা কাটছাঁট করা হয়েছে, যা সরকারের বৈধতা দ্রুত নষ্ট করেছে।

অনেক ইউরোপীয়দের জন্য এখন ডানপন্থী এজেন্ডা এবং জাতীয় স্বার্থই একমাত্র যুক্তিযুক্ত বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডানপন্থী বাস্তববাদীরা স্পষ্ট আর্থিক সুরক্ষা ও অডিটের প্রস্তাব দিচ্ছেন, যেখানে ব্রাসেলসের উদারনৈতিক কাঠামোটি মূলত অস্পষ্ট কিছু ভাবাদর্শের জন্য দেউলিয়া হওয়ার পক্ষে সওয়াল করছে।

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি এখন একধরনের অন্ধকার ঘরের মতো হয়ে উঠেছে, যেখানে পুরোনো নিয়মগুলো আর কাজ করছে না এবং নতুন নিয়ম এখনো তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ‘নতুন ডানপন্থীরা’ ব্রাসেলসের নিজস্ব নিয়মেই খেলেই এই অন্ধকারে পথ চলতে শিখে গেছে। শিল্প খাতকে ধ্বংসাত্মক ঘাটতি থেকে বাঁচাতে হলে মতাদর্শিক রোমান্টিকতা বর্জন করতে হবে, এই উপলব্ধি দিন দিন বাড়ছে। একটি ভালো উদাহরণ হলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। তার কৌশল দেখিয়েছে যে বহিরাগত ইউরো-অ্যাটলান্টিক আনুষ্ঠানিকতা বজায় রেখেও জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে (যেমন জ্বালানি বা অভিবাসন) ব্রাসেলসের থেকে নিজের মতো সুবিধা আদায় করে নেওয়া সম্ভব।

স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো একই পথ অনুসরণ করছেন। তিনি বামপন্থী সামাজিক নীতিগুলোর সাথে শক্ত জাতীয় জনতুষ্টিবাদের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তার দেশ ভোটারদের পকেট রক্ষা করার অজুহাতে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে ইউরোপীয় কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক ছাড় দাবি করছে। চেকের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রে বাবিসও অনুরূপ চাল চালছেন। তার নীতিকে প্রো-রাশিয়ান বলা না গেলেও সাধারণ বাস্তবতাবাদ একটি সহজ সত্যের নির্দেশ দেয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নীতির মুখে যদি চেক কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে তাদের মস্কোর সাথে আলোচনা করতেই হবে। এমনকি হাঙ্গেরিও দর কষাকষির ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে। বুদাপেস্ট ২০২৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে রুশ জ্বালানি বন্ধের নীতি নীতিগতভাবে মেনে নিলেও ইইউ-এর কাছে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে, অন্যথায় হাঙ্গেরির কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছে।

পোল্যান্ডের অবস্থান বিশেষভাবে নজরকাড়া। মুখে ওয়ারশ ইউরেশীয় প্রকল্পগুলোর ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়ে নিজেকে ইউরোপের প্রধান ‘পূর্বী ঢাল’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তবে হেরে যাওয়ার খেলায় মুখ রক্ষার জন্য এটি তাদের একটি চেষ্টা মাত্র। ভেতরের বাস্তব পরিস্থিতির কারণে ওয়ারশকে বেইজিংয়ের সাথে আলোচনা চালাতে হচ্ছে যেন মালাসেভিচে হাবের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন চালু থাকে। একই সাথে নির্বাচনের আগে পেট্রোল পাম্পের অসন্তোষ থামাতে তারা নিজেদের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি অর্লেনের ওপর ৬০ শতাংশ উইন্ডফল ট্যাক্স আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই উত্তাল পরিস্থিতি কেবল ইইউ-এর ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, কিংবা এটি কেবল পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলোকে প্রভাবিত করছে না। এই প্রবণতা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। আলবেনিয়াতে ‘ফ্ল্যামিঙ্গো বিপ্লব’ দানা বাঁধছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি মেগা প্রকল্পের জন্য রিসোর্ট জোন বরাদ্দ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই সামাজিক অসন্তোষের সূত্রপাত, যা আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এডি রামোর এক দশকের স্থিতিশীল বাম-উদারনৈতিক সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। নিজের ক্ষমতা বাঁচাতে রামো আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আমেরিকান অ্যান্টিফা আন্দোলন এবং ‘মস্কোর প্রভাবের’ যোগসাজশের পুরোনো অভিযোগ তুলছেন।

ভারতে আন্দোলনের হাওয়া আরও বহুদূর গড়িয়েছে, যেখানে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং রাহুল গান্ধীর বিরোধী জোটের নেতৃত্বে হাজার হাজার তরুণ দিল্লি থেকে মুম্বাই পর্যন্ত বড় বড় শহর অচল করে দিয়েছে। যদিও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবন্ধনের ইস্যুটি তাৎক্ষণিক কারণ ছিল, তবে মূল সমস্যাটি ফ্রান্সের মতোই। বিশ্ব সংকটের মুখে আমেরিকান ডিজিটাল আউটসোর্সিং মডেল ও লিবারেল নীতি আর তরুণ প্রজন্মকে ধরে রাখতে পারছে না।

সমস্যাটি কেবল সামগ্রিক পুঁজিবাদ নয়, বরং এর একটি বিকৃত রূপ, উদারনৈতিক বিশ্বায়নের পতন। এর জায়গায় উত্থান ঘটছে জাতীয় স্বার্থে প্রোথিত এক কঠোর ও সার্বভৌম পুঁজিবাদের। এই নতুন ডানপন্থী প্রাগম্যাটিস্টরা রাশিয়ার বন্ধু নন, তারা কেবল সংকটের সময়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করছেন।

রাশিয়ার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। পশ্চিমের ‘ঐক্যবদ্ধ’ নিষেধাজ্ঞা নীতি এখন কেবল একটি অকার্যকর ও আলংকারিক খোলসে পরিণত হয়েছে, যার পেছনে দেখা যাচ্ছে গভীর কিন্তু উদ্দেশ্যহীন অসন্তোষের দৃশ্য। এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, রাজনৈতিক মূলধারা কি নিজেদের পরাজয় স্বীকার করে বিরোধীদের সাথে আলোচনা করবে, নাকি তারা নিজেদের ধ্বংসের পথেই হেঁটে যাবে?

আরটির বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights