যুক্তরাজ্যের আদালতে এআইয়ের ভুয়া নজির, উদ্বেগে আইন বিশেষজ্ঞরা

অনলাইন ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) তৈরি করা একটি অস্তিত্বহীন মামলার নজির যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টে উপস্থাপন করেছেন দেশটির সরকারি কৌঁসুলি।

ইন্টারনেটে আইনি তথ্য খুঁজতে গিয়ে এআইয়ের তৈরি সারসংক্ষেপ থেকে ওই ভুয়া নজিরটি পাওয়া যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটিকে ‘গুরুতর ব্যর্থতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন আইন ও এআই বিশেষজ্ঞরা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের (সিপিএস) জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি রবিন্দর ধিলন একটি শিশুর বিরুদ্ধে মামলা চালানোর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের সময় ‘সিপিএস বনাম আর বনাম জে (২০২৪) ইডব্লিউসিএ ক্রিম ৩৫২৯’ নামে একটি মামলার নজির উল্লেখ করেন। পরে দেখা যায়- এমন কোনো মামলার অস্তিত্বই নেই।

ওই মামলায় ১১ বছর বয়সী এক বালকের বিরুদ্ধে তার ছোট বোনকে ধর্ষণের অভিযোগে বিচার চালানোর সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। শিশুটির আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, মামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সমাজকর্মী, যুবকর্মী ও একজন ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানীর দেওয়া বক্তব্য যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি প্রসিকিউটররা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে ধিলন শিশুটির বিরুদ্ধে বিচার চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে সিপিএসের প্রধান কৌঁসুলিও তা অনুমোদন করেন। তবে অক্টোবরে ধিলন স্বীকার করেন, মামলার উদ্ধৃতিটি ভুল ছিল। তার দাবি, তিনি ১৫ বছর আগের একটি বাস্তব মামলার রায় উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন।

দ্য গার্ডিয়ান জানতে পেরেছে, ইন্টারনেটে আইনি তথ্য অনুসন্ধানের সময় পাওয়া এআই-তৈরি সারসংক্ষেপে ওই কাল্পনিক মামলার তথ্য ছিল। তবে কীভাবে সেটি যাচাই ছাড়াই আদালতে উপস্থাপন করা হলো, সে বিষয়ে দুই জ্যেষ্ঠ হাইকোর্ট বিচারক ধিলনের ব্যাখ্যাকে ‘অসন্তোষজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। আদালত অবশ্য জানিয়েছে, ভুয়া নজিরটি শিশুটির করা চ্যালেঞ্জের রায়ে কোনো প্রভাব ফেলেনি। তার বিচার যুব আদালতে হওয়ার কথা রয়েছে।

মেয়নুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এআই-সংক্রান্ত বিচারিক কার্যক্রমের গবেষক ব্রায়ান ফ্লানাগান ঘটনাটিকে ‘গুরুতর ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, একটি শিশুর বিরুদ্ধে মামলা চালানোর পক্ষে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন আইনি নজির ব্যবহার করা হয়েছে, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। এতে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিচারব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তিনি বলেন, পেশাজীবীদের জন্য এ ধরনের ভুল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুতর, কারণ রাষ্ট্রের ক্ষমতা অনেক বেশি।

এদিকে সিপিএস জানিয়েছে, তাদের এআই ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর নীতিমালা রয়েছে। আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করা যাবে না এবং এআই থেকে পাওয়া তথ্যের যথার্থতা অবশ্যই মানুষকে যাচাই করতে হবে। সংস্থাটির এক মুখপাত্র বলেন, ইন্টারনেটে আইনি তথ্য অনুসন্ধানের সময় একটি ভুল হয়েছিল। বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর তা সংশোধন করা হয়েছে এবং কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা জানতে অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে নির্ভরযোগ্য আইনি উৎস থেকে মামলার নজির উদ্ধৃত করার বিষয়েও কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এটি সিপিএসের ক্ষেত্রে এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি ভুয়া আইনি নজির ব্যবহারের দ্বিতীয় পরিচিত ঘটনা। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত একটি মামলায় সংস্থাটির এক আইনজীবী অস্তিত্বহীন আইনি নজির উল্লেখ করেছিলেন। ওই ঘটনাতেও এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা উঠে আসে। যুক্তরাজ্যে এআই-সংক্রান্ত ভুল ও বিতর্কিত আইনি উদ্ধৃতির ঘটনাগুলো নিয়ে ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের আইনজীবী ম্যাথিউ লি একটি তালিকা সংরক্ষণ করছেন। সর্বশেষ ঘটনাটি যুক্ত হওয়ার পর তালিকায় এমন ঘটনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০১। তার মতে, প্রকাশিত ঘটনাগুলো প্রকৃত সমস্যার একটি ছোট অংশ হতে পারে, কারণ নিম্ন আদালতের অনেক রায় প্রকাশিত হয় না।

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, বিচারিক কাজে এআই ব্যবহারের ফলে গোপনীয়তা ও সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি আইনজীবীদের জমা দেওয়া নথিতে উদ্ধৃত প্রতিটি মামলার সত্যতা যাচাই করতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। এর আগে, ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি ভুয়া আইনি উদ্ধৃতি আদালতে উপস্থাপনের বিষয়ে আইনজীবীদের সতর্ক করেছিল। আদালত বলেছিল, এ ধরনের অপব্যবহার বিচারপ্রক্রিয়া ও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে।

তথ্য সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights