বিরোধীরা একাট্টা, এখনও সুতোয় ঝুলছে নেতানিয়াহুর ভাগ্য
অনলাইন ডেস্ক
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সমীকরণ ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা ও তীব্র অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক শিবিরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাায় এবার রাষ্ট্রক্ষমতার মসনদে কে বসবেন, তা নিয়ে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন পরিবর্তনপন্থী বিরোধী জোট এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের কোনোটিই ১২০ আসনবিশিষ্ট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে পারেনি।
এই অচলাবস্থার মাঝেই মঙ্গলবার বিরোধী শিবিরের দলগুলো প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। আইজেনকটের শিবিরের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি দলই তাকে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দিয়েছে। তবে এই বিরোধী শিবিরে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, নির্বাচনে আশ্চর্যজনক সাফল্য পাওয়া আরব দলগুলোর সঙ্গে তারা ঐক্য গড়বে কি না।
নির্বাচনের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, আইজেনকটের পরিবর্তনপন্থী বিরোধী জোট ৪৮টি আসন লাভ করেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী শিবির পেয়েছে ৫৩টি আসন, যার মধ্যে নেতানিয়াহুর নিজের দল লিকুদ পার্টি একাই লাভ করেছে ২৭টি আসন। এ নির্বাচনে আরব-প্রধান দলগুলো দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়ে রেকর্ড ১৯টি আসনে জয়লাভ করেছে, যার ফলে তারা বর্তমানে সরকার গঠনের প্রধান ‘কিংমেকার’ বা নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরব দলগুলোকে বাদ দিয়ে একটি ‘বৃহৎ জাতীয় সরকার’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। গত সোমবার লিকুদ পার্টির অফিশিয়াল টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন, নেসেটের একক বৃহত্তম দল হিসেবে তার নেতৃত্বেই পরবর্তী জোট সরকার গঠিত হওয়া উচিত। নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলের ইহুদি জনগণের একটি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ লিকুদকে বৃহত্তম দল হিসেবে বেছে নিয়েছে এবং আগামী সরকার পরিচালনার জন্য তাকেই নির্বাচিত করেছে। তিনি এমন একটি সর্বদলীয় ও বৃহৎ সরকার গড়তে চান যেখানে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে না এমন যেকোনো রাজনৈতিক দল যোগ দিতে পারবে। তবে যেসব আরব-প্রধান দল সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে এবং ইহুদি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের জোট গঠন বা সমঝোতার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ করে দেন বর্ষীয়ান এই নেতা।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন ইসরায়েলের আরব রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। তবে তারা হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা থেকে বিরত থেকেছেন। আরব দলগুলোর মধ্যে রাআম পার্টির প্রধান ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও অন্য আরব নেতারা এই সংজ্ঞাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। নির্বাচনের আগে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দুটি প্রধান আরব জোটের প্রধানরা জানিয়েছিলেন, তাদের মূল লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের বর্তমান ‘বর্ণবাদী’ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
তবে বিরোধী শিবিরের ভেতরেও আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া নিয়ে তীব্র মতভেদ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী শিবিরের জন্য এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা এটিই। পরিবর্তনপন্থী জোটের অন্যতম শরিক বামপন্থী দ্য ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়াইর গোলান সরকার গড়তে আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা ও অংশীদারত্বের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন। কিন্তু ঠিক বিপরীত অবস্থান নিয়েছেন ডানপন্থী ইসরায়েল বেইতেনু দলের প্রধান অ্যাভিগডোর লিবারম্যান। তিনি আরব দলগুলোর সহায়তায় সরকার গঠনের তীব্র বিরোধিতা করছেন। আইজেনকটের নিজের দল সরাসরি কিছু না বললেও কৌশলে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা এড়িয়ে যাচ্ছে। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের মধ্য-ডানপন্থী ‘টুগেদার’ পার্টি এ বিষয়ে এখনো তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সুপারিশ এবং সংসদীয় অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে দেশটির প্রেসিডেন্ট সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ও যোগ্য প্রার্থীকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। নেতানিয়াহুর পক্ষে তার চরম ডানপন্থী শরিক দলগুলো এবং চরম-গোঁড়া অর্থোডক্স শাস পার্টি সমর্থন জানাবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে অপর একটি অর্থোডক্স রাজনৈতিক দলের অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ বুধবার থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শ বা বৈঠক শুরু করবেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাউকে মনোনীত করতে প্রেসিডেন্টের হাতে আগামী ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সময় রয়েছে। প্রেসিডেন্ট যাকে প্রথম সুযোগ দেবেন, তিনি সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন, যা প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
প্রথম মনোনীত প্রার্থী যদি নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করে সরকার গঠনে ব্যর্থ হন, তবে প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় কোনো প্রার্থীকে আবার একই মেয়াদের জন্য সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে পারেন। কিন্তু যদি দ্বিতীয় প্রার্থীও ব্যর্থ হন, তবে নেসেটের যেকোনো ৬১ জন আইনপ্রণেতা যৌথভাবে প্রেসিডেন্টকে তৃতীয় কোনো প্রার্থীকে মনোনীত করার অনুরোধ পাঠাতে পারবেন। পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে সেই প্রক্রিয়াও ব্যর্থ হলে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং দেশকে আবারও একটি নতুন সাধারণ নির্বাচনের দিকে হেঁটে যেতে হবে।
সূত্র: এএফপি
