শুক্রবার বর্ণিল জন্মদিন পালন, মঙ্গলবার না ফেরার দেশে
রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম
‘আমার একটাই মেয়ে। ২২ বছর বয়স। গত শুক্রবারে তার জন্মদিন পালন করেছে। আত্মীয়স্বজন সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিল। সবাইকে নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে জন্মদিন পালন করে। মনে হয়, সে চলে যাবে, তাই সবাইকে দাওয়াত দিয়েছে। আমার মেয়ে অনেক খুশি হয়েছিল। আজ আমার দুনিয়া শেষ, আমার সব শেষ। আমি মেনে নিতে পারছি না।’
মঙ্গলবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মাইশা মুশফিরাতের (২২) বাবা সাখাওয়াত হোসেন কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলেন। মাইশা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় আরও তিন ছাত্রী আহত হয়েছেন।
মাইশা মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটতাকিয়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি সাখাওয়াত হোসেন ও সালমা আক্তারের মেয়ে। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন ছিলেন তিনি।
জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে ক্যাম্পাসের সামনে রাস্তা পারাপারের অপেক্ষায় ছিলেন মাইশাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ সময় একটি মিনিবাস তাঁদের সামনে এসে দাঁড়ায়। পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি লরি বাসটিকে ধাক্কা দিলে সেটি উল্টে মাইশার ওপর পড়ে। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
দুর্ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ পেয়েছে। এতে দেখা যায়, দুটি লরি প্রতিযোগিতা করে চলছিল। এ সময় একটি লরি সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা মিনিবাসটিকে ধাক্কা দেয়। এতে বাসটি কাত হয়ে উল্টে যায় এবং মাইশা সেটির নিচে চাপা পড়েন।
বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট শফিউল ইসলাম বলেন, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক এলাকায় মিনিবাস থেকে ওই ছাত্রী নামেন। কিছুক্ষণ পর মিনিবাসটি তাঁর ওপর উল্টে পড়ে। একই ঘটনায় বাসটির নিচে চাপা পড়ে আরও তিনজন আহত হন। স্থানীয় লোকজন লরি দুটি আটক করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লরি দুটি ও মিনিবাসটি উদ্ধার করে হাইওয়ে থানায় নিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশিক বলেন, সীতাকুণ্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে আনা হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মারুফুল হক বলেন, দুর্ঘটনার আশঙ্কায় তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পথচারী-সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।
শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ
সড়ক দুর্ঘটনায় আইআইইউসির শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদ ও পথচারী-সেতু নির্মাণের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে তাঁরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে ১০ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা পাশের রেললাইনে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করেন। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথও অবরোধ করেন তাঁরা। এতে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন আটকা পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগও।
অবরোধকারী শিক্ষার্থীরা জানান, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়। ক্যাম্পাসের সামনে প্রায়ই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। আগেও দুর্ঘটনার পর প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বাদী হয়ে মামলা করা, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লরির চালককে গ্রেফতার, চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের দুই পাশে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং প্রধান ফটকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা।
আইআইইউসির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী শাহ নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তখন মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। ২০১৮ সালেও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন তাঁরা। এবার এমন সমাধান চান, যাতে ভবিষ্যতে আর কারও প্রাণ না যায়। বিচার, জবাবদিহি ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোস্তফা মনির চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি প্রশাসনের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কুমিরা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম আলম বলেন, দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। তাঁরা পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে কিছু দাবি তুলে ধরেন। আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের কথা শিক্ষার্থীদের জানানো হয়। পরে তাঁরা অবরোধ তুলে নিলে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
