কতোজন নভোচারী এখন পর্যন্ত মহাকাশে গেলেন, সংখ্যায় এগিয়ে কোন দেশ?
অনলাইন ডেস্ক
মহাকাশ বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় ইতিহাস স্মরণে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ’। মানবজাতির কল্যাণে মহাকাশ প্রযুক্তির অসামান্য অবদানকে সামনে রেখে প্রতি বছরের চার থেকে দশই অক্টোবর জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় এই দিবসটি। ষাট দশকের শুরু থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের আধুনিক বাণিজ্যিক মহাকাশভ্রমণ পর্যন্ত মানুষের এই অসীম যাত্রায় এ পর্যন্ত নানা প্রকার পেশাদার মহাকাশচারী থেকে শুরু করে কোটিপতি পর্যটকসহ অন্তত ৭৪৬ জন মানুষ মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছেন। বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে মানবজাতির এই অবিরাম মহাকাশ অভিযানের নানা তথ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আজ থেকে প্রায় ৬৯ বছর আগে ১৯৫৭ সালের এই দিনটিতেই তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘স্পুটনিক ১’ কক্ষপথে উৎক্ষেপণ করে। এর মাধ্যমেই উন্মোচিত হয় আধুনিক মহাকাশ যুগের নতুন দিগন্ত, যা পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক তীব্র মহাকাশ প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। এই ঘটনার ঠিক এক দশক পর ১৯৬৭ সালের ১০ অক্টোবর আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর হয় ঐতিহাসিক ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ বা বহিঃমহাকাশ চুক্তি। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ ৪ থেকে ১০ অক্টোবর সময়কালকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই বিশেষ সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, জাদুঘর এবং অ্যাস্ট্রোনমি ক্লাবগুলো তারাকা দর্শন, বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠদান, প্রদর্শনী এবং মহাকাশচারী ও বিজ্ঞানীদের আলোচনার আয়োজন করে থাকে। বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ মহাকাশে নিজেদের কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম হয়েছে এবং এর মধ্যে ৫০টিরও বেশি দেশের নাগরিক সরাসরি মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
মানবজাতির ইতিহাস বদলে দিয়ে ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে পাড়ি জমান সোভিয়েত মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন। নিজের ‘ভোস্টক ১’ মহাকাশযানে চেপে তিনি ১০৮ মিনিটের এক রোমাঞ্চকর ফ্লাইটে ঘণ্টায় প্রায় ২৭ হাজার ৪০০ কিলোমিটার গতিতে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। যাত্রাশেষে প্যারাশুটের মাধ্যমে নিরাপদে মাটিতে নেমে আসেন তিনি। এই ঐতিহাসিক মিশন প্রমাণ করে দেয় যে মানুষ মহাশূন্যের উৎক্ষেপণ, ওজনহীনতা এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের মতো চরম প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে সক্ষম। এর মধ্য দিয়েই স্নায়ুযুদ্ধের সেই যুগে মহাকাশ প্রতিযোগিতায় প্রথম বড় ধরনের বিজয় অর্জন করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।
এর ঠিক ছয় বছর পর কার্যকর হওয়া আউটার স্পেস ট্রিটিতে স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই চুক্তির মূল কথা ছিল মহাকাশকে কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে অন্বেষণ ও ব্যবহার করতে হবে এবং কোনো দেশ কোনো অবস্থাতেই একে নিজস্ব ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক এই চুক্তির মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নাসা’র ঐতিহাসিক ‘অ্যাপোলো ১১’ মিশন চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম পদচিহ্ন আঁকে। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই প্রথম মানব হিসেবে চাঁদের মাটিতে পা রেখে ইতিহাসে অমর হয়ে যান মার্কিন নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং।
তবে মহাকাশের সীমা আসলে কোথায় শুরু হয় তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সংস্থা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০০ কিলোমিটার বা ৬২ মাইল ওপরের ‘কারমান লাইন’কে মহাকাশের সীমানা বলে গণ্য করে। অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী, নাসা এবং ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ৮০ কিলোমিটার বা ৫০ মাইল উচ্চতা অতিক্রম করলেই তাকে মহাকাশভ্রমণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই দূরত্বটি আপাতদৃষ্টিতে অনেক বেশি মনে হলেও রূপক অর্থে যদি পৃথিবীকে একটি আপেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে মহাকাশের শুরুটা হবে ঠিক সেই আপেলের খোসার পুরুত্বের সমান দূরত্বে।
কারমান লাইনের পরিমাপ অনুযায়ী এ পর্যন্ত বিশ্বের ৫২টি দেশের অন্তত ৭৪৬ জন মানুষ মহাকাশ সফর করেছেন। এদের মধ্যে যেমন রয়েছেন পেশাদার বৈজ্ঞানিক মহাকাশচারী, তেমনই রয়েছেন বিপুল অর্থের বিনিময়ে ভ্রমণ করা বাণিজ্যিক পর্যটকরাও। ভ্রমণকারীদের মধ্যে অনেকের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে, আবার কেউ কেউ এমন দেশের প্রতিনিধিত্ব করে মহাকাশে গিয়েছিলেন যা আজ আর অস্তিত্বেই নেই, যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন। তবে সামগ্রিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখনো পর্যন্ত বিশ্বের দুটি দেশ এই ক্ষেত্রে বিশাল আধিপত্য বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র একাই সর্বোচ্চ ৩৬৯ জন মানুষকে মহাকাশে পাঠিয়েছে, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়া যৌথভাবে পাঠিয়েছে ১৩৮ জন। নিজস্ব রকেটে মানুষ পাঠাতে সক্ষম পৃথিবীর তৃতীয় দেশ চীন এ পর্যন্ত ২৯ জনকে মহাকাশে পাঠিয়েছে।
বিজ্ঞান কল্পকাহিনির পাতায় মহাকাশযানের অধিনায়ক হিসেবে নারীদের অহরহ দেখা গেলেও বাস্তব জগতের মহাকাশ অভিযান এখনো পুরুষদের মাধ্যমেই প্রধানত নিয়ন্ত্রিত। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মহাকাশে যাওয়া ৭৪৬ জনের মধ্যে নারী রয়েছেন মাত্র ১১২ জন, যা মোট সংখ্যার ১৫ শতাংশ বা সাতজনের মধ্যে মাত্র একজন। ১৯৬৩ সালের জুনে সোভিয়েত মহাকাশচারী ভ্যালেন্টিনা তেরেশকোভা প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়ে মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এর প্রায় বিশ বছর পর ১৯৮৩ সালের জুনে প্রথম মার্কিন নারী হিসেবে স্যালি রাইড মহাকাশে যাত্রা করেন। তবে আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক মহাকাশ ফ্লাইটের সুবাদে মহাকাশে নারীদের অংশগ্রহণের হার ক্রমশ বাড়ছে। বস্তুত ২০২০ সালের পর থেকে যতজন নারী মহাকাশে গেছেন, তাদের অর্ধেকেরও বেশি ব্লু অরিজিনের সাব-অরবিটাল রকেটে যাত্রী বা অতিথি হিসেবে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
বয়সের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, অধিকাংশ মহাকাশচারীই তাদের জীবনের প্রথম অভিযানে গিয়েছেন ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে। মোট ভ্রমণকারীর ৮৫ শতাংশই এই নির্দিষ্ট বয়সসীমার অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের গড় বয়স প্রায় ৪০ বছর। তবে বর্তমানের বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলো এই বয়সের গণ্ডি অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে। ২০২১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ মহাকাশচারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন অলিভার ডেমেন। অন্যদিকে ২০২৪ সালে ৯০ বছর ৮ মাস বয়সে মহাকাশে গিয়ে সবচেয়ে বয়স্ক ভ্রমণকারীর রেকর্ড গড়েন এড ডুইট। এর আগে ২০২১ সালে ৯০ বছর ৬ মাস বয়সে মহাকাশে গিয়ে এই বিশ্বরেকর্ডটি নিজের দখলে রেখেছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনার।
মানবজাতির মহাকাশযাত্রার আগামী দিনগুলো আরও রোমাঞ্চকর হতে চলেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক আর্টেমিস ২ মিশনে মহাকাশচারীরা চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেন, যা ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো ১৩ মিশনের ঐতিহাসিক রেকর্ডকে ভেঙে দেয়। এই ধারায় আগামী ২০২৭ সালে আর্টেমিস ৩ মিশনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা পৃথিবীর কক্ষপথে স্পেস এক্স এবং ব্লু অরিজিনের নির্মিত লুনার ল্যান্ডারগুলোর সঙ্গে ডকিং পরীক্ষা পরিচালনা করবে। এরপর নাসা ২০২৮ সালের আর্টেমিস ৪ মিশনকে মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার উদ্দেশ্য ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে পুনরায় মানুষকে অবতরণ করানো। অন্যদিকে ২০২৭ সালে ভারত তাদের প্রথম মানববাহী ‘গগনযান’ ফ্লাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে, যা সফল হলে ভারত হবে নিজস্ব রকেটে মহাকাশে মানুষ পাঠানো পৃথিবীর চতুর্থ দেশ। একই সঙ্গে চীনও ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদের বুকে নিজেদের নভোচারী পাঠানোর লক্ষ্যে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।
সূত্র: মহাকাশ
