ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর মাদক ‘কুশ’
মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম
মাদকের অন্ধকার জগতে নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে ল্যাবে তৈরি ভয়ংকর মাদক ‘কুশ’। উচ্চমাত্রার আসক্তি ও কিছু ভ্রান্ত ধারণার কারণে যা দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে দেশের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম, মধ্যবিত্ত এবং অভিজাত শ্রেণির পার্টিগুলোতে। অন্যান্য মাদকের তুলনায় কয়েক গুণ শক্তিশালী কুশ মানুষের মস্তিষ্কে অত্যন্ত দ্রুত এবং গভীর আসক্তি তৈরি করে। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত তরুণরা এতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তাই এ মাদক দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের মধ্য ও উচ্চবিত্ত সমাজে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিতে বেচাকেনা হচ্ছে ফুড ডেলিভারি বা রাইড শেয়ারিং কর্মীদের মাধ্যমে। মাদকবিষয়ক গবেষক ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়ন কবির খন্দকার বলেন, ‘কুশ নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়ামের একশ্রেণির শিক্ষার্থীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এটি প্রাকৃতিক এবং ইয়াবার মতো ক্ষতিকর নয়। এ ভুল ধারণা থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কৌতুহলবশত এটি গ্রহণ করে দ্রুত আসক্ত হয়ে পড়ছে।’
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক মানজারুল ইসলাম বলেন, ‘মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে কুশের কিছু চালান জব্দ করেছে। এ মাদকের বিস্তার রোধে কাজ করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।’ অনুসন্ধানে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফেরা একশ্রেণির তরুণের হাত ধরে ২০১৪-২০১৫ সালের দিকে বাংলাদেশে গোপনে ‘কুশ’র অনুপ্রবেশ ঘটে। সে সময় সীমিত পরিসরে বিদেশ থেকে পার্সেলের মাধ্যমে এটি এনে রাজধানীর গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত এলাকার বিভিন্ন ক্লাব ও প্রাইভেট পার্টিতে সরবরাহ করা হতো। তিন-চার বছরের ব্যবধানে ‘কুশ’ ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত এলাকায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার ওয়ারীতে ক্যালিফোর্নিয়া ফেরত আরেক যুবকের বাসার ছাদে কুশের ল্যাব ধরা পড়ে। পরবর্তীতে জুলাই ও আগস্ট মাসে শাহজালাল বিমানবন্দরে থাইল্যান্ড-ভারত-বাংলাদেশের ত্রিদেশীয় চক্রের কাছ থেকে কয়েক দফায় প্রায় ১৯ কেজি এবং সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৬ কোটি টাকা মূল্যের ১২ কেজি কুশ জব্দ করা হয়। কুশের সরবরাহ চেইন প্রচলিত মাদক সিন্ডিকেটের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং প্রযুক্তিনির্ভর। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রামে গোপন বা ‘ক্লোজড গ্রুপ’ তৈরি করে কোড নেমের মাধ্যমে কেবল পরিচিত ও যাচাইকৃত ক্রেতাদের কাছে পণ্যের ছবি ও দাম পাঠানো হয়। ক্রেতা অনলাইনে অর্ডার কনফার্ম করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করার পর সাধারণ ফুড ডেলিভারি বা রাইড শেয়ারিং কর্মীদের মাধ্যমে বেচাকেনা হচ্ছে। অনেক সময় নির্দিষ্ট স্থানে পার্সেল রেখে ক্রেতাকে লোকেশন জানিয়ে দেওয়া হয়।
কুশ কারবার নিয়ন্ত্রকদের প্রায় সবাই উচ্চশিক্ষিত, প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন তরুণ, বিদেশফেরত শিক্ষার্থী কিংবা অভিজাত পরিবারের বখে যাওয়া সন্তান। অনেকে নিজের নেশার খরচ জোগাতে এবং অল্প সময়ে বিপুল অর্থ আয়ের লোভে বন্ধু মহলে ডিলার হিসেবে কাজ করে। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পাশাপাশি এখন উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণরাও বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এবং আধুনিক সাজার প্রতিযোগিতায় নিজেদের জমানো টাকা বা পরিবারের অজান্তে অর্থ সংগ্রহ করে এর নিয়মিত ক্রেতা হয়ে উঠছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে মূলত ল্যাবে তৈরি ‘কুশ’ ছড়িয়ে পড়ছে। এ মাদক গাঁজার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর ও জটিল। তৈরি বিভিন্ন সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড, ফেন্টানিল, ট্রামাডল কিংবা ঘুমের ওষুধের রাসায়নিক মিশ্রণ প্রাকৃতিক গাঁজার শুকনো পাতার ওপর স্প্রে করে এটি তৈরি করা হয়। এর কোনো নির্দিষ্ট গন্ধ না থাকায় সহজে শনাক্ত করা যায় না। এ ছাড়া কুশ তৈরির গাঁজা চাষে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কৃত্রিম আলো ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করে চাষ করা হয়। সাধারণ গাঁজায় যেখানে নেশা সৃষ্টিকারী উপাদান টিএইচসির মাত্রা থাকে ৪ থেকে ৮ শতাংশ, সেখানে কুশে টিএইচসির মাত্রা ৩০ শতাংশের বেশি। কুশ সেবনে মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। যা তরুণ বয়সেই আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক ঝুঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া রাসায়নিক মিশ্রিত কুশ সেবনে কিডনি ও লিভার দ্রুত কার্যক্ষমতা হারায়।
