ট্রাম্পের সঙ্গে তিক্ততার মধ্যেই তুরস্কে শুরু হচ্ছে ন্যাটো সম্মেলন

অনলাইন ডেস্ক

ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধের মধ্যেই আগামী সপ্তাহে তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে একত্রিত হচ্ছেন বিশ্ব নেতারা। সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা তেহরান ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সৃষ্ট মতপার্থক্য একপাশে সরিয়ে রাখার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন।

একইসঙ্গে জোটের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি কমিয়ে আনার পরও ইউরোপের সুরক্ষায় ন্যাটোর ভূমিকা তুলে ধরবেন নেতারা।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে জানিয়েছেন, আগামী মঙ্গল ও বুধবারের এই সম্মেলনে রাশিয়াকে যেকোনো আক্রমণ থেকে বিরত রাখতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতির বিষয়টি দৃশ্যমান হবে। এ সময় কয়েক হাজার কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।

নেতারা মস্কোর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের লড়াইয়ের জন্য অস্ত্র সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়েও অঙ্গীকার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তুর্কি প্রেসিডেন্ট তাইয়েপ এরদোয়ানের আয়োজিত নৈশভোজে যোগ দেবেন। এ সময় তিনি এরদোয়ান ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাও করবেন।

ইউরোপীয় কর্মকর্তারা আশা করছেন, এরদোয়ান ও রুটের সঙ্গে ট্রাম্পের সুসম্পর্ক এই সম্মেলনকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করবে। তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আটলান্টিক-পার (ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে) বিদ্যমান তিক্ততা এবং ন্যাটোর বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমালোচনার কারণে তারা এ বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছেন না।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার(২ জুলাই) ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ন্যাটো সদস্যদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র অর্থ ব্যয় করছে, অথচ এর বিনিময়ে তারা কোনো সুবিধাই পাচ্ছে না।

রুটে এবং ন্যাটোর অন্যান্য নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই জোট যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তায়ও অবদান রাখে এবং নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের আহ্বানে ইউরোপীয়রা সাড়া দিচ্ছে। রুটে বলছেন, ইউরোপীয়রা আরও বেশি দায়িত্ব নিচ্ছে।

বুধবার বার্লিনে রুটে বলেন, আগামী সপ্তাহের সম্মেলনে বাড়তি অর্থ ব্যয়কে কীভাবে যুদ্ধ-প্রস্তুত সক্ষমতায় রূপান্তর করা যায় এবং কীভাবে আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত করা যায়—তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ন্যাটো একটি আটলান্টিক-পার জোট ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, তবে একে আরও ভালো অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের এর ভারসাম্য পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার পাশাপাশি ইউরোপীয় মিত্ররা এবং কানাডা ইউরোপে প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আরও বেশি দায়িত্ব গ্রহণ করছে।

রুটে গত মাসে জানিয়েছিলেন, ন্যাটো-র ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলো এবং কানাডা ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা খাতে আগের বছরের তুলনায় ৯০ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করেছে, যার ফলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৫৭০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

গত বছর হেগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ন্যাটো নেতারা ২০৩৫ সালের মধ্যে অস্ত্র ও সেনার মতো মূল প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ৩.৫% ব্যয় করার বিষয়ে সম্মত হন—যা আগের ২% লক্ষ্যের চেয়ে বেশি। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার মতো প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে জিডিপির আরও ১.৫% বিনিয়োগ করার বিষয়েও তারা একমত হন।

ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের হুমকি এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল।

ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ইরান যুদ্ধ শীর্ষ সম্মেলনের মূল বিষয়বস্তুকে আড়াল করে ফেলতে পারে। যদি বর্তমানে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি অবস্থায় থাকা এই সংঘাত নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করে, অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে পর্যাপ্ত সহায়তা না করার কারণে ট্রাম্প ইউরোপীয়দের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আক্রান্ত কোনো ন্যাটো সদস্যকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ন্যাটো কর্মকর্তারা মনে করেন, ইরান ইস্যুতে মতবিরোধের পরও অনেক ইউরোপীয় নেতা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও ভূখণ্ডে অবস্থিত ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিল।

এছাড়াও ইরান ইস্যুতে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ও বিদায়ী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মতো ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যকার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ফাটল ধরিয়েছিল। শীর্ষ সম্মেলনে সেই তিক্ততা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

ন্যাটোর একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, আমি আশাবাদী এমন কিছু হবে না। নেতারা জানেন, এখানে কী ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আর যদি সত্যিই তেমন কিছু ঘটে, তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমাদের হাতে তো ‘সর্বোত্তম বিবাহ-পরামর্শদাতা’ মার্ক রুটে আছেনই।”

সূত্র: রয়টার্স।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights