তরুণ বিজ্ঞানীদের টানা ১৫ বছর অর্থ সহায়তা দিচ্ছে চীন, উল্টো পথে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক

তরুণ বিজ্ঞানীদের বড় ধরনের গবেষণায় উৎসাহিত করতে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। দেশটির ন্যাশনাল ন্যাচারাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের প্রধান দু জিয়ানকাং সম্প্রতি নতুন এক বিশেষ অনুদানের ঘোষণা দিয়েছেন, যেখানে নির্বাচিত তরুণ গবেষকরা একটানা ১৫ বছরের জন্য নিশ্চিত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাবেন। যেখানে প্রাথমিক শর্ত কেবল একটাই, বিজ্ঞানীদের ল্যাবরেটরিতে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি। তবে এ অর্থায়ন চীনের মূল প্রযুক্তিগত বিকাশে সহায়তা করলেও দেশটির কঠোর সেন্সরশিপ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা উদ্ভাবনের পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চীনের এই নতুন কর্মসূচির আওতায় ৩৫ বছরের কম বয়সী নির্বাচিত তরুণ গবেষকরা প্রতি পাঁচ বছর পর পর তাদের বরাদ্দ অর্থ দ্বিগুণ করার সুযোগ পাবেন। প্রথম বছরে যে ৪৪ জন গবেষককে বাছাই করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৯ জনই বিদেশ থেকে এসেছেন। যেখানে বিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থ হয়ে নতুন করে চেষ্টা করার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়, সেখানে চীন সরকারের এই ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে চীন যখন সময় কিনে তরুণ প্রতিভাদের ধরে রাখার চেষ্টা করছে, তখন উল্টো পথ ধরেছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছরের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা ও গবেষণার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করতে শুরু করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিদেশি শিক্ষার্থীদের অবস্থান চার বছরে সীমিত করার নিয়ম কার্যকর করেছে, যার ফলে এফ-১ ভিসার সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে। পাশাপাশি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) এবং ন্যাশনাল সাইন্স ফাউন্ডেশনের শত শত সক্রিয় গবেষণা অনুদান হঠাৎ স্থগিত বা বাতিল করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সেখানকার গবেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পিছুটানের মাঝেই চীন তাদের দেশের এই বিশেষ পদক্ষেপে একটি পুরোনো মার্কিন মডেলকেই কাজে লাগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড হিউজেস মেডিকেল ইনস্টিটিউট বহু আগে থেকেই নির্দিষ্ট প্রকল্পের বদলে ব্যক্তি কেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি অনুদান দিয়ে আসছিল, যার ফলে সেখানে গবেষকদের বড় ধরনের সাফল্য অর্জনের হার অনেক বেশি ছিল। চীন সেই মার্কিন পাঠ গ্রহণ করলেও কেবল অর্থই একটি দেশের গবেষণা সংস্কৃতির একমাত্র নিয়ন্ত্রক হতে পারে না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখা যায়, চীন তাদের বিজ্ঞানীদের পশ্চিমা ধাঁচের আকর্ষণীয় বেতন ও ল্যাবরেটরি সুবিধা দিতে পারলেও বাকস্বাধীনতা কিংবা মুক্ত পরিবেশ পুরোপুরি দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সম্প্রতি ফিল্ডস মেডেলজয়ী চীনা বংশোদ্ভূত গণিতবিদদের বিদেশি শিক্ষক ও পরামর্শকদের কাছ থেকে গঠনমূলক আলোচনার যে সুযোগ পাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে, চীনা সংস্কৃতিতে কোনো জুনিয়র বিজ্ঞানী তার সিনিয়র প্রফেসরের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতভেদ করার সেই সুযোগ প্রায় পান না।

এর ওপর যোগ হয়েছে নতুন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। সম্প্রতি কার্যকর হওয়া চীনের এক্সিট আইনের কারণে কারিগরি নিরাপত্তার অজুহাতে যেকোনো গবেষক বা তাদের পরিবারকে দেশত্যাগে বাধা দেওয়া সম্ভব। ফলে একদিকে যেমন বিদেশি মেধাবীরা চীনে আসার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ভাবছেন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি এই সহায়তার আড়ালে স্বাধীনতা হারানোর একটি ভয়ও তৈরি হচ্ছে।

অবশ্য এসবের মধ্যেও চীনের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অমার ইয়াগির মতো বেশ কয়েকজন নোবেল বিজয়ী ও বিশ্বমানের বিজ্ঞানী সম্প্রতি বার্কলে ছেড়ে বেইজিংয়ের তসিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো মুক্ত আলোচনা ও চমৎকার বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্কের কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এই টানাপোড়েনের মাঝে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। সিঙ্গাপুর এবং অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যেই মোটা অঙ্কের তহবিল ও তরুণ গবেষকদের আকৃষ্ট করার নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে দেশ একই সাথে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং মুক্ত বৈজ্ঞানিক বিতর্কের সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে, প্রযুক্তি ও গবেষণার জগতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত তারই হাতে থাকবে।

সূত্র: এশিয়া টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights