পা দিয়ে লিখে অনার্স-মাস্টার্স, তবু মেলেনি চাকরি
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
দুই হাতের পরিবর্তে পা দিয়ে লিখে এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন রাজিয়া খাতুন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর শিক্ষার পথে বাধা হতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমে উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেও এখনো মেলেনি কর্মসংস্থানের সুযোগ। অসুস্থ বাবা ও অসচ্ছল পরিবারের মধ্যে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। তাঁর এখন একটাই প্রত্যাশা—একটি চাকরি। নিজের যোগ্যতায় স্বাবলম্বী হয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চান রাজিয়া।
রাজিয়া খাতুন ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মিস্ত্রিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা ফয়জুল হক। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে রাজিয়া একমাত্র বোন। তাঁর ভাইয়েরা সবাই দিনমজুর। বিয়ে করে তাঁরা আলাদা সংসার করছেন। অন্যদিকে, বাবা অসুস্থ থাকায় পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। এমন পরিস্থিতিতে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে রাজিয়ার।
শৈশব থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন তিনি। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে দেননি। পা দিয়ে লিখে বালিয়াডাঙ্গী পাইলট মডেল হাইস্কুল থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পাস করেন। এরপর বালিয়াডাঙ্গী সমীর উদ্দিন মহাবিদ্যালয় থেকে একই বিভাগে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেও এখনো জোটেনি চাকরি।
রাজিয়া খাতুন বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে পা দিয়ে লিখে পড়াশোনা শেষ করেছি। এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স ও মাস্টার্স করেছি। আমার ইচ্ছা একটি চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। পরিবারের অবস্থাও ভালো নয়। বাবা অসুস্থ, ভাইয়েরা দিনমজুরি করে নিজেদের সংসার চালান। আমি কারও বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। একটি চাকরির সুযোগ পেলে নিজের জীবনটা নতুন করে গুছিয়ে নিতে পারব। আমি কাজ করতে চাই, নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চাই।’
রাজিয়ার বাবা ফয়জুল হক বলেন, ‘মেয়েটা অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। হাত দিয়ে লিখতে পারে না, পা দিয়ে লিখেই অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেছে। মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে আমাদের অনেক আশা ছিল। কিন্তু এখন আমি অসুস্থ, সংসারের অবস্থাও ভালো নয়। মেয়েটার জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা হলে সে নিজের মতো করে চলতে পারত। আমরা চাই, সে একটা সম্মানজনক কাজের সুযোগ পাক।’
রাজিয়ার মা বলেন, ‘মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করেছে। পা দিয়ে লিখে এতদূর পড়াশোনা শেষ করেছে। আমরা চাই, সে একটা চাকরি করুক, নিজের পায়ে দাঁড়াক। আমাদের সামর্থ্য সীমিত। মেয়েটার একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা কিছুটা কমত।’
শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতিকূলতা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন রাজিয়া। এখন তাঁর অপেক্ষা একটি কর্মসংস্থানের। তাঁর চাওয়া করুণা নয়, নিজের শিক্ষা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ। সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতারা তাঁর পাশে দাঁড়ালে একটি চাকরিই হতে পারে স্বাবলম্বী জীবনের নতুন সূচনা।
