বাংলাদেশের আর্থিক সংস্কারে ঐকমত্য

আলী রিয়াজ

আর্থিক খাতের সংস্কারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নীতিগতভাবে ঐকমত্য হয়েছে বাংলাদেশের। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত ঋণ কর্মসূচির বেশির ভাগ শর্তের সঙ্গেই একমত হয়েছে বাংলাদেশ। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গতকাল শুরু হওয়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনে এসব বিষয়ে মতৈক্য হয়। সম্মেলনে বাংলাদেশ নতুন ঋণচুক্তির বিষয়ে আইএমএফ-এর সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে এ সম্মেলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশ্ব অর্থনীতির নীতিনির্ধারণী, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে সম্মেলন। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী ও উন্নয়ন সহযোগীসহ ১৯১ দেশের ১৫ হাজারেরও বেশি প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশ অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে রয়েছেন- প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।

সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ৪৫০ কোটি ডলার নতুন ঋণ চুক্তি দিয়ে উভয়পক্ষ নীতিগত একমত হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইএমএফের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে ইতিবাচক সম্মতি প্রদান করা হয়েছে। প্রথম দিনের অধিবেশন শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, সংস্কারের বিষয়ে মৌলিক বড় ধরনের মতপার্থক্য নেই। কিছু নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা চলছে। একসঙ্গে অনেকগুলো সংস্কার বাস্তবায়নের চাপ না দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার বাস্তবায়নের সময় ও পর্যায় নিয়ে আলোচনা হলেও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সব চ্যালেঞ্জের সমাধান সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি হবে। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। এ চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার পাশাপাশি অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সরকার আশাবাদী। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তেল ও গ্যাসের দাম সমন্বয় করা হলে ভর্তুকির প্রয়োজনও তৈরি হবে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্বব্যাংক সহায়তা দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সাংবাদিকদের বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে।

জ্বালানি সংকট ও বাড়তি ঋণের চাপ মোকাবিলায় গুরুত্ব : ব্যাংকক সম্মেলনে বিশ্ব অর্থনীতির দুই নীতিনির্ধারক সংস্থা জ্বালানি সংকট, বাড়তি ঋণের চাপ, ইরান যুদ্ধের প্রভাব থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায় সেসব নিয়ে আলোচনা করেন। সম্মেলনের আলোচনায় উঠে আসে বিশ্ব অর্থনীতি এখন বিপরীতমুখী দুটি শক্তির টানাপোড়েনে রয়েছে। একদিকে জ্বালানি সরবরাহে নেতিবাচক ধাক্কা, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাহিদায় ইতিবাচক উল্লম্ফন। বৈঠকে প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে তুলে ধরা হয় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব।

থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিনিয়োগ ও যৌথ উৎপাদনের উদ্যোগ : প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন ও শিল্পায়নের মতো খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে থাই ব্যবসায়ীদের আগ্রহ রয়েছে। এসব পণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি রপ্তানি আয় ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

রেনং-চট্টগ্রাম সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাড়ানোর আলোচনা : থাইল্যান্ডের রেনং বন্দর ও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। দুই বন্দরের সংযোগ উন্নত করা গেলে কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া থাইল্যান্ডসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি (আরসিইপি) কাঠামোর সুযোগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা।

বিনিয়োগ বাড়াতে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক সংস্কার : বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের সামনে বড় বাধা হয়ে রয়েছে আর্থিক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি। এসব কারণে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights