বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল তেলের দাম
অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের হুমকিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বন্ড ও শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপও বেড়েছে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলারে পৌঁছায়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তেল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা যোগ হওয়ায় বাজারে সরবরাহ-সংকটের ভয় আরও তীব্র হয়েছে।
ইরানে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের খবর।
দ্য আটলান্টিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করতে পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছে হোয়াইট হাউস। প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, সম্ভাব্য হামলার পরিধি, লক্ষ্যবস্তু এবং আদৌ হামলা চালানো হবে কি না- এসব বিষয় এখনও আলোচনায় রয়েছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর আগে ধারণা করা হচ্ছিল, আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসন সংঘাত আর বাড়াতে চাইবে না।
তবে দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমে একটি ‘সীমিত অভিযান’ চালানো হতে পারে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় থাকতে পারে।
হরমুজে জাহাজে হামলা, সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
ইরানের বিরুদ্ধে আরেক দফা হামলার আশঙ্কা মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ইতোমধ্যে অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে।
এর মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসব হামলার ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কমেছে এবং বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
সর্বশেষ বুধবার কাতারের উত্তর উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজে একাধিক প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই পথে চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবেও উৎপাদন কমার শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তেলের দাম বাড়িয়েছে।
আটলান্টিক মহাসাগরের চলতি মৌসুমের প্রথম হারিকেনে পরিণত হয়েছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ‘ইসাইয়াস’। ঝড়টি মেক্সিকো উপসাগরের দিকে অগ্রসর হওয়ায় ওই অঞ্চলে তেল ও গ্যাস উৎপাদন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঝড়ের প্রভাবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে তেল কোম্পানি শেল ও শেভরন জানিয়েছে, তারা ওই অঞ্চলে তাদের কিছু উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দিচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঝড়টি শুক্রবার অথবা শনিবার স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে।
ফলে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন কমার আশঙ্কা- দুই ধরনের ঝুঁকি একই সময়ে তেলের বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং কোম্পানি মারস্ক জানিয়েছে, তারা সব রফতানি পণ্য সংগ্রহ এবং আমদানি পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে জরুরি জ্বালানি সারচার্জ বাড়াচ্ছে।
জ্বালানি ব্যয় বাড়ার ফলে পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লে তা নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়ানোর পথে যেতে হতে পারে- এমন আশঙ্কাও জোরালো হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে বন্ড ও শেয়ারবাজারে।
বন্ডবাজারেও বিক্রির চাপ
বৃহস্পতিবারও বৈশ্বিক বন্ডবাজারে বিক্রির চাপ অব্যাহত ছিল। বিশেষ করে ঋণের বোঝা ও সরকারি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের কারণে ফ্রান্সের বাজারে চাপ ছিল বেশি।
ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার বৃহস্পতিবার ৬ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৪ দশমিক ৯৩১ শতাংশে পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে এই সুদহার ৪ দশমিক ৯৯৪ শতাংশে উঠেছিল, যা ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।
বন্ডের দাম কমলে তার সুদহার বা ইয়িল্ড বাড়ে। ফলে ফ্রান্সের বন্ড ইয়িল্ডের এই বৃদ্ধি দেশটির ঋণ ও সরকারি ব্যয় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউরোপের ঋণবাজারের অন্যতম প্রধান সূচক জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইয়িল্ডও বৃহস্পতিবার ২ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৩ দশমিক ৫০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি, যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা এবং বাড়তে থাকা পরিবহন ব্যয়—এসব কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম আরও বাড়লে তার প্রভাব মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
