মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কায় এখনও চড়া পশ্চিমমুখী বিমানভাড়া

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্দেশে বিমানভাড়া এখনও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের কোনও বড় বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি নিয়ে পশ্চিমে যাওয়ার তুলনায় সরাসরি ফ্লাইটের অতিরিক্ত ভাড়া এখন আবার ২০২৫ সালের গড় পর্যায়ে ফিরে এসেছে।

বুধবার প্রকাশিত এয়ার ট্রাফিক পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল (এসিআই) এশিয়া-প্যাসিফিক ও মধ্যপ্রাচ্য। ৬০০টির বেশি বিমানবন্দরের প্রতিনিধিত্বকারী এই বাণিজ্যিক সংগঠনটি যাত্রীসংখ্যার ভিত্তিতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সংযোগকারী শীর্ষ ১০০টি রুট বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক থেকে পশ্চিমা দেশগুলোতে সরাসরি ফ্লাইটের ভাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রাবিরতিসহ ফ্লাইটের তুলনায় গড়ে ১৮ শতাংশ বেশি ছিল।

তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। মার্চে সরাসরি ফ্লাইটের ভাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রাবিরতি নেওয়া ফ্লাইটের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি হয়ে যায়। এপ্রিলে এই ব্যবধান প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছে যায়।

পরবর্তী সময়ে অবশ্য চিত্র বদলাতে শুরু করে। মে ও জুনে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাওয়া ফ্লাইটের ভাড়া সরাসরি ফ্লাইটের তুলনায় বেশি হয়ে যায়। এর কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমান সংস্থাগুলোর ভাড়া বাড়ানো এবং ওই অঞ্চলে ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল এশিয়া-প্যাসিফিক ও মধ্যপ্রাচ্যের মহাপরিচালক স্টেফানো বারোনচি বলেন, এশিয়া-প্যাসিফিক থেকে মধ্যপ্রাচ্য এড়িয়ে সরাসরি পশ্চিমমুখী ফ্লাইটের ভাড়ার অতিরিক্ত অংশ বর্তমানে আবার ২০২৫ সালের গড় পর্যায়ে ফিরে এসেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বিমানভাড়া স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

বারোনচি বলেন, “প্রকৃত ভাড়ার হিসাবে মধ্যপ্রাচ্য এড়িয়ে চলা সরাসরি ফ্লাইট এবং মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাওয়া- উভয় ধরনের ফ্লাইটের ভাড়াই ২০২৫ সালের তুলনায় এখনও বেশি। এবং এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে।”

মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরে ফ্লাইট কমেছে
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচল ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের ১১টি প্রধান বিমানবন্দর তাদের স্বাভাবিক নির্ধারিত ফ্লাইটের মাত্র ৬৬ শতাংশ পরিচালনা করতে পেরেছে।

তবে আগস্টে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ওই মাসে বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম পরিচালন সক্ষমতা স্বাভাবিক সময়ের ৮০ শতাংশের বেশি পর্যায়ে ফিরে আসে।

বারোনচি বলেন, প্রতিবেদনটি তৈরির সময় ধারণা করা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলো ধীরে ধীরে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারলে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে পশ্চিমমুখী বিমানভাড়া স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই পূর্বাভাসকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

তার ভাষায়, “বাস্তব পরিস্থিতি সম্ভবত এই পূর্বাভাসকে চ্যালেঞ্জ করবে।”

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কয়েকটি বিমান সংস্থা সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ফ্লাইট বন্ধ বা স্থগিত করেছে।

চলতি মাসের শুরুতে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস ও তাদের বাজেট সহযোগী স্কুট সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ফ্লাইট বাতিলের মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। হংকংভিত্তিক ক্যাথে প্যাসিফিকও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ফ্লাইট ২০২৭ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত স্থগিত রেখেছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম আগের তুলনায় বাড়লেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বিমান সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্তের কারণে এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক রুটগুলো এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

সরাসরি ফ্লাইটের অতিরিক্ত ভাড়া আবার আগের পর্যায়ে
যুদ্ধ শুরুর পর এশিয়া-প্যাসিফিক থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর সরাসরি ফ্লাইটের ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাওয়া রুটগুলোর ওপর ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া।

মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট কমে যাওয়ায় ওই রুটে আসনসংখ্যা কমেছে। একই সময়ে যেসব যাত্রী যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন, তাদের চাহিদা সরাসরি ফ্লাইটের দিকে বেড়েছে। এর ফলে মার্চ ও এপ্রিলে সরাসরি ফ্লাইটের ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে চলাচলকারী ফ্লাইটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলো ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ায় সরাসরি ফ্লাইটের তুলনামূলক বাড়তি খরচ কমতে থাকে।
ফলে বর্তমানে সরাসরি ফ্লাইটের ভাড়া ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাওয়া ফ্লাইটের ভাড়ার ব্যবধান ২০২৫ সালের গড় পর্যায়ে ফিরলেও উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃত ভাড়া আগের বছরের তুলনায় বেশি রয়েছে।

এশিয়ার বিমান চলাচলে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব
এদিকে একই দিনে প্রকাশিত এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল এশিয়া-প্যাসিফিক ও মধ্যপ্রাচ্যের আরেক প্রতিবেদনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (আসিয়ান) অর্থনীতিতে বিমান চলাচল খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় সরাসরি অবদান রেখেছে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর।

চাঙ্গি বিমানবন্দর সরাসরি সিঙ্গাপুরের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৭৯০ কোটি মার্কিন ডলার অবদান রেখেছে। এর তুলনায় থাইল্যান্ডের সব বিমানবন্দর মিলিয়ে সরাসরি অবদান ছিল ৩১০ কোটি ডলার এবং মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরগুলোর অবদান ছিল ৩০০ কোটি ডলার।

আর বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার মতো সূচক বিবেচনায় সিঙ্গাপুরের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিমান চলাচল খাতের অবদান ছিল প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার- যা আসিয়ান অঞ্চলে সর্বোচ্চ।

পর্যটনে বিমান চলাচল খাতের প্রভাবও হিসাব করলে ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরের জিডিপিতে এ খাতের মোট অবদান দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার। একই সময়ে খাতটি প্রায় ৫ লাখ ৯৭ হাজার কর্মসংস্থানকে সহায়তা করেছে।

তবে সামগ্রিক আর্থসামাজিক মূল্য বিবেচনায় আসিয়ানে সিঙ্গাপুর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। প্রথম অবস্থানে ছিল থাইল্যান্ড। দেশটির পর্যটন খাতে বিমান চলাচলের মাধ্যমে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় সামগ্রিক হিসাবে থাইল্যান্ড এগিয়ে ছিল।

সরকারি রাজস্বেও এগিয়ে সিঙ্গাপুর
বিমান চলাচল খাত থেকে সরকারি রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও আসিয়ানে শীর্ষে ছিল সিঙ্গাপুর।

২০২৫ সালে দেশটির বিমান চলাচল কার্যক্রম থেকে সরাসরি কর হিসেবে সরকারের রাজস্ব এসেছে প্রায় ৩১০ কোটি মার্কিন ডলার। এর তুলনায় মালয়েশিয়ার বিমান চলাচল খাত থেকে সরকারি রাজস্ব ছিল ১৫০ কোটি ডলার এবং থাইল্যান্ডের ১৩০ কোটি ডলার।

বারোনচি বলেন, সিঙ্গাপুরের বিমান চলাচল খাতের প্রায় সব সূচকেই দেশটি অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, আসিয়ানের বিমান চলাচল খাত থেকে সরাসরি যে জিডিপি সৃষ্টি হয়, তার ৪২ শতাংশই সিঙ্গাপুর থেকে আসে।

এর পেছনে দেশটির উচ্চমূল্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বড় আকারের মূলধনী বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং ব্যবসাবান্ধব অবকাঠামোর ভূমিকা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

২০৫৬ সালে যাত্রীসংখ্যা ২৯০ কোটি হতে পারে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আসিয়ান অঞ্চলের বিমান চলাচল খাত মোট ২ কোটি ৩৩ লাখ কর্মসংস্থানকে সহায়তা করেছে এবং আঞ্চলিক জিডিপিতে প্রায় ২৪ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার অবদান রেখেছে।

আগামী কয়েক দশকে এ অঞ্চলের বিমান চলাচল আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বিমানবন্দর দিয়ে বার্ষিক যাত্রী চলাচল ২০২৪ সালের প্রায় ৬৫ কোটি থেকে বেড়ে ২০৫৬ সালে ২৯০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর রুট ও সক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক থেকে পশ্চিমমুখী বিমানভাড়া কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। সূত্র: স্ট্রেইটস টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights