মৃত্যুর দুয়ার থেকে বোনকে ফেরাল যমজের এক স্পর্শ!

অনলাইন ডেস্ক

সময় হওয়ার ঠিক ১২ সপ্তাহ আগেই পৃথিবীর আলো দেখেছিল দুই যমজ বোন কাইরি ও ব্রিয়েল। ১৯৯৫ সালের ১৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মেসেচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ‘মেডিকেল সেন্টার অব সেন্ট্রাল মেসেচুসেটস’ হাসপাতালে তাদের জন্ম হয়। জন্মের সময় পুতুলসম ছোট দুটি শিশুর প্রত্যেকের ওজন ছিল মাত্র দুই পাউন্ডের কাছাকাছি। অসময়ে পৃথিবীতে আসার কারণে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চলছিল তাদের।

হাসপাতালের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সংক্রামক ব্যাধি এড়াতে দুজনকে রাখা হয় দুটি আলাদা ইনকিউবেটরে। বোন কাইরি কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে ওজন বাড়াতে থাকলেও ব্রিয়েলের অবস্থা ক্রমেই আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। জন্মের প্রায় তিন সপ্তাহ পর, ১২ নভেম্বর ব্রিয়েলের শ্বাস-প্রশ্বাস মারাত্মক ব্যাহত হতে শুরু করে। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে যায়, হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে যেতে থাকে এবং অক্সিজেন অভাবে তার শরীর নীলচে-ধূসর বর্ণ ধারণ করে। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণিত হচ্ছিল এবং কূল-কিনারা না পেয়ে স্বজনেরা ব্রিয়েলকে হারানোর প্রহর গুনছিলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে অবিশ্বাস্য ও ব্যতিক্রমী এক সিদ্ধান্ত নেন এনআইসিইউ-এর দায়িত্বরত অভিজ্ঞ নার্স গেইল কাসপারিয়ান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে, ইউরোপের একটি প্রাচীন পদ্ধতির কথা মাথায় রেখে তিনি বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে দুই বোনকে একই ইনকিউবেটরে পাশাপাশি শুইয়ে দেন।

ইনকিউবেটরের কাচের দরজা বন্ধ করার সাথে সাথেই ঘটে সেই অলৌকিক ঘটনা! একটুও দেরি না করে অসুস্থ বোন ব্রিয়েল আস্তে আস্তে কাইরির গা ঘেঁষে ঘুমিয়ে পড়ে। কাইরি তার ছোট্ট বাঁ হাতটি বাড়িয়ে বোন ব্রিয়েলের কাঁধ ও গায়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরে।

দুই বোনের এই ভালোবাসার স্পর্শের পর অলৌকিক রূপ পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায় মনিটরে। মুহূর্তের মধ্যে ব্রিয়েলের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করে, দ্রুত গতিতে চলা হৃদস্পন্দন শান্ত হয় এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে। মৃত্যুর দুয়ার থেকে বোনকে ফিরিয়ে আনে কাইরির সেই ছোট্ট আলিঙ্গন।

স্থানীয় ‘টেলিগ্রাম ও গ্যাজেট’ পত্রিকার আলোকচিত্রী ক্রিস ক্রিস্টো এই মুহূর্তটির একটি ছবি তোলেন, যা পরবর্তীতে ‘দ্য রেসকিউয়িং হাগ’ (জীবন বাঁচানো আলিঙ্গন) নামে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে দেয়। এই ঘটনাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে এবং “ডাবল বেডিং” বা যমজ শিশুদের একসাথে রেখে সুস্থ করে তোলার আন্তর্জাতিক গবেষণায় গতি আনে।

সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা কাইরি ও ব্রিয়েল আজ পূর্ণবয়স্ক ও সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। বিজ্ঞান আর ভালোবাসা যেখানে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল, কাইরি ও ব্রিয়েলের সেই আলিঙ্গন আজ বহুকাল ধরে চিকিৎসা জগতে ভালোবাসার শক্তির অনন্য সাক্ষী হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights