সাক্ষাতের তিন মাসের মধ্যেই বিয়ের প্রস্তাব জাপানে : ভালোবাসার খোঁজে এবার করপোরেট ঘটক

অনলাইন ডেস্ক

জীবনসঙ্গী খুঁজতে ডেটিং অ্যাপে একের পর এক ছবি দেখা, বার্তা আদান-প্রদান, তারপর দেখা করতে গিয়ে হতাশ হওয়া। এমন অভিজ্ঞতায় ক্লান্ত জাপানের তরুণদের অনেকে এবার ফিরছেন পুরোনো এক ব্যবস্থায়। তবে এবার ঘটক আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশী নন, পেশাদার পরামর্শক। তাঁদের কাজ উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে দেওয়া, সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া, এমনকি বিয়ের প্রস্তাবের প্রস্তুতিও করিয়ে দেওয়া।

জাপানে এই নতুন ধারার কেন্দ্রে রয়েছে টোকিওভিত্তিক ঘটকালি প্রতিষ্ঠান আইবিজে। প্রথম সাক্ষাতের তিন মাসের মধ্যে বিয়ের প্রস্তাবের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তরুণদের আকৃষ্ট করছে। তাদের দাবি, জাপানের প্রতি ২৫টি বিয়ের একটির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত তাদের সেবা।

২৮ বছর বয়সী তাইজেন ইয়াসুদা এই প্রতিষ্ঠানেরই একজন সদস্য। ডেটিং অ্যাপে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচয় ও বার্তা বিনিময়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সঙ্গী খুঁজে না পেয়ে তিনি আইবিজেতে যোগ দেন। তাঁর ভাষায়, বিয়ের লক্ষ্য যাঁর সঙ্গে মেলে, তাঁকে দ্রুত খুঁজে পাওয়ার উপায় হিসেবেই তিনি এই সেবা বেছে নিয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার এক মাসের মধ্যেই দুজন সম্ভাব্য সঙ্গীকে বেছে নিয়েছেন ইয়াসুদা। তাঁদের একজনকে নিয়ে ঘুরতেও গেছেন। তবে শুধু পরিচয় করিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন না প্রতিষ্ঠানের পরামর্শকেরা। কী পোশাক পরতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে, সাক্ষাতে কোন বিষয়ে আলোচনা করা উচিত, সেসব নিয়েও চলে প্রস্তুতি।

সম্প্রতি এক পরামর্শকের সঙ্গে সাক্ষাতে নিজের কর্মক্ষেত্রের চাপ নিয়ে কথা বলছিলেন ইয়াসুদা। তাঁর উত্তর শুনে পরামর্শক বুঝিয়ে দেন, কথাটি অন্যভাবে বললে আরও ইতিবাচক শোনাবে। আবার তাঁকে উৎসাহও দেন। সম্পর্কের শুরু থেকে বিয়ের প্রস্তাব পর্যন্ত এভাবেই পাশে থাকেন তাঁরা।

আইবিজের প্রধান নির্বাহী শিগেরু ইশিজাকার ভাষ্য, মানুষকে দ্রুত বিয়ের লক্ষ্যে পৌঁছাতে এমন সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে, যা কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

পুরোনো ঘটকালির নতুন রূপ

জাপানে শত শত বছর ধরে প্রচলিত ছিল ‘ওমিয়াই’ প্রথা। আত্মীয়স্বজন, পারিবারিক বন্ধু কিংবা কর্মক্ষেত্রের ঊর্ধ্বতনেরা অবিবাহিত নারী-পুরুষের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিতেন। সময়ের সঙ্গে সেই প্রথার জায়গা নেয় নিজেদের পছন্দে সম্পর্ক গড়া এবং পরে ডেটিং অ্যাপ। এখন সেই অ্যাপে হতাশ তরুণদের একটি অংশ আবার সরাসরি মানুষের সহায়তা চাইছেন।

প্রণয়ের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণাকারী তোকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক জুনকো ইয়ামাদার মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে সম্পর্কের পথ দেখানোর জন্য একজন অভিজ্ঞ মানুষের ওপর ভরসা করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। বিয়েতে আন্তরিক নন, এমন মানুষদের আগেই বাদ দেওয়ার সুযোগও এসব প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তার একটি কারণ।

তবে এই সেবা সস্তা নয়। সদস্যদের মাসে ৩০ থেকে ১০০ ডলার দিতে হয়। ভর্তি ফি ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ ডলার। বাগদান সম্পন্ন হলে দিতে হয় আরও ১ হাজার ৩০০ ডলার। বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক বা একসঙ্গে বসবাসের মতো নিষিদ্ধ কাজের জন্যও একই অঙ্কের জরিমানা রয়েছে।

সমালোচকদের মতে, এভাবে বিয়েকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় পরিণত করা হচ্ছে। প্রবীণ ঘটক ইকুকো কাতো মনে করেন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু ব্যবসায়িক হিসাব দিয়ে মানুষের আবেগ বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর দাবি, ৪৪ বছরে তিনি ১ হাজার ৩০০টির বেশি দম্পতির বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন, যাঁদের কারও বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি।

বিয়ে যখন জনসংখ্যা বাড়ানোর কৌশল

জাপানে কমতে থাকা জনসংখ্যা ও জন্মহার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ঘটকালির এই ব্যবসা বাড়ছে। দেশটিতে সন্তান নেওয়ার সঙ্গে বিয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় আরও বেশি মানুষকে বিয়েতে উৎসাহিত করাও জনসংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ।

আইবিজের সদস্যসংখ্যা গত পাঁচ বছরে বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির আয় বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে, জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে জন্মসংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। ১১ বছরের মধ্যে এই প্রথম ওই সময়ে জন্মসংখ্যা বাড়ল।

ইয়াসুদার ইচ্ছা, দ্রুত বিয়ে করে তিন থেকে চারটি সন্তান নেওয়া। তাঁর মতো তরুণদের দেখে আইবিজের প্রধান নির্বাহী মনে করেন, নতুন প্রজন্ম বিয়ের প্রতি আগ্রহ হারায়নি। বরং উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার কার্যকর পথ খুঁজছে।

জাপানে সেই পথের নাম এখন করপোরেট ঘটকালি।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights