সার থেকে কাপড়—সব কিছুতেই তেল নির্ভরতা, বিকল্প খুঁজছে বিশ্ব

অনলাইন ডেস্ক

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা আবারও প্রমাণ করেছে—বিশ্বের অর্থনীতি এখনো গভীরভাবে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। শুধু জ্বালানি নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য পণ্যের ভিত্তিই হলো পেট্রোকেমিক্যাল বা তেলভিত্তিক রাসায়নিক। দাঁত মাজার ব্রাশ থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন, খাবারের প্যাকেট, কার্পেট, আসবাব, এমনকি কাপড়—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে তেল বা গ্যাস।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় ৯০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে পেট্রোকেমিক্যালের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া তেলের মোট চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ এবং গ্যাসের ৮ শতাংশ শুধু এই রাসায়নিক খাতেই ব্যবহৃত হয়। তবুও শক্তি আলোচনায় এটি অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে।

সবচেয়ে বেশি তেলনির্ভর তিনটি খাত হলো সার, প্লাস্টিক ও বস্ত্রশিল্প—যেগুলো মিলিয়ে পেট্রোকেমিক্যালের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক খাদ্য উৎপাদন নির্ভর করে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সার বা ইউরিয়ার ওপর, যা গ্যাস থেকে উৎপাদিত অ্যামোনিয়া দিয়ে তৈরি। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সাহায্যে তৈরি ‘সবুজ হাইড্রোজেন’ ব্যবহার করে বিকল্প অ্যামোনিয়া উৎপাদন সম্ভব। যদিও এর খরচ বেশি, তবে এতে নির্ভরতা কমবে এবং পরিবেশের ক্ষতিও কম হবে।

তবুও পুরোপুরি রাসায়নিক সার বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সার ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, জৈব উপাদানের আংশিক ব্যবহার এবং ফসল ঘুরিয়ে চাষের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। বর্তমানে ব্যবহৃত সারের বড় অংশই পানি ও বাতাসে নষ্ট হয়ে যায়, যা বড় সমস্যা।

প্লাস্টিকের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। অধিকাংশ প্লাস্টিক তেলভিত্তিক এবং রিসাইক্লিং হারও খুবই কম—মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ। এর বিকল্প হিসেবে ভুট্টা, আখ, সামুদ্রিক শৈবাল ও খাদ্যবর্জ্য থেকে তৈরি জৈব প্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা চলছে। বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া দিয়ে তৈরি কিছু প্লাস্টিক পরিবেশে সহজে ভেঙে যায়, যা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বর্তমানে এর উৎপাদন বিশ্বব্যাপী মোট প্লাস্টিকের তুলনায় খুবই কম।

পোশাক শিল্পেও তেলের আধিপত্য স্পষ্ট। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭৩ শতাংশ বস্ত্রই সিন্থেটিক বা কৃত্রিম আঁশ দিয়ে তৈরি, যা পেট্রোকেমিক্যাল নির্ভর। তুলা, উল, পাট বা রেশমের মতো প্রাকৃতিক বিকল্প রয়েছে, কিন্তু সেগুলো দামি এবং উৎপাদনও সীমিত। তাছাড়া এসব প্রাকৃতিক আঁশ উৎপাদনেও আবার সার ও রাসায়নিক লাগে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তি দিয়ে নয়—সমস্যার সমাধান নির্ভর করছে ভোগের ধরন বদলের ওপরও। কম কিনে বেশি দিন ব্যবহার, পুনর্ব্যবহার ও মেরামতের সংস্কৃতি গড়ে তোলা না গেলে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো কঠিন হবে। সূত্র : গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights