হুয়াফার ৬২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের চাপে চীনের ক্রেডিট মার্কেটে বড় ধাক্কা!
অনলাইন ডেস্ক
চীনের ক্রেডিট মার্কেট গত দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধসের মুখে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হলেই যে সরকারি সম্পর্কের জোরে আর্থিক সংকট থেকে বাঁচা যায়- একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর চরম আর্থিক সংকটে পড়ার ঘটনা সেই বিশ্বাসকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ‘জুহাই হুয়াফা গ্রুপ কো’ নামক প্রতিষ্ঠানটি এই ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এ বিষয়ে অবগত কয়েকজন গত সোমবার জানিয়েছেন, দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডং প্রদেশের স্থানীয় সরকারের পুরোপুরি মালিকানাধীন এই শিল্পগোষ্ঠীটি দুটি ট্রাস্ট প্রোডাক্টের পেমেন্ট মিস করেছে (টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে)। এছাড়া কিছু ব্যাংক ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে।
শুক্রবার নাগাদ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। কারণ, চীনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। তাই এমন পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।
সোমবার পর্যন্ত দুই দিনে চীনের করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগ ধরে রাখতে বিনিয়োগকারীরা যে গড় সুদের হার দাবি করেন, তা ১০ দশমিক ৩ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর দুই দিনের হিসাবে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। তবে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে হুয়াফার মতো স্থানীয়ভাবে সর্বোচ্চ ‘এএএ’ রেটিং পাওয়া তিন বছর মেয়াদি ইউয়ান বন্ডের সুদের হারে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা।
৩৩০ মিটার উঁচু ঝুহাই টাওয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণে ভূমিকা রাখা হুয়াফার বর্তমান সংকট চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। এসব কোম্পানি অনেক সময় সরকারের পরোক্ষ সহায়তার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চলা আবাসন খাতের মন্দা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে হুয়াফার বিদেশি মুদ্রায় ইস্যু করা বন্ডের দাম ব্যাপকভাবে কমে যায়। একপর্যায়ে এসব বন্ডের দাম অভিহিত মূল্যের প্রায় ৫৪ শতাংশে নেমে আসে। কোম্পানিটির সুদবাহী ঋণের পরিমাণ ৪১৩ বিলিয়ন ইউয়ান (২৫৩.১৬ বিলিয়ন মালয়েশীয় রিঙ্গিত)। এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বন্ডের দাম কমে যায়।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্রেডিটসাইটসের এশিয়া ক্রেডিট কৌশল বিভাগের প্রধান জারলিনা জেং জানান, স্থানীয় সরকারের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল- এমন কিছু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি যেন বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা টাইম বোমা!
হুয়াফার সংকটের প্রভাব কিছু সময়ের জন্য চীনের অভ্যন্তরীণ ঋণবাজারের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে চীনের উচ্চ সুদের হারের ডলার বন্ডগুলো প্রায় এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সপ্তাহ পার করেছে। অন্যদিকে, দেশটির অভ্যন্তরীণ সরকারি ঋণবাজারে শুক্রবার ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ফিউচার লেনদেনে বড় ধরনের দরপতন হয়। মার্চের পর একদিনে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় পতন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, হুয়াফার সংকটের কারণে বিভিন্ন বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন সরকার সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে সহায়ক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারগুলোর ঋণসংক্রান্ত ঝুঁকি কমাতে নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে এ ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। তাই হুয়াফার বর্তমান আর্থিক বিপর্যয় বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এছাড়া হুয়াফার প্রধান কার্যালয় চীনের গুয়াংডং প্রদেশে হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ, চীনের সব প্রদেশের মধ্যে গুয়াংডংয়ের অর্থনীতি সবচেয়ে বড়। সূত্র: ব্লুমবার্গ
