২৫ বছরের জমানো অর্থে নির্মিত হলো ‘আব্দুল করিম সেতু’
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
দীর্ঘ ২৫ বছরের কষ্টার্জিত সঞ্চয় এবং মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের অদম্য ইচ্ছাশক্তির সমন্বয়ে কুড়িগ্রামের উলিপুরে নির্মিত হয়েছে একটি কাঠের সেতু। এই মানবিক উদ্যোগের সফল কারিগর চল্লিশোর্ধ্ব আব্দুল করিম, যিনি নিজ এলাকায় ইতোমধ্যেই প্রশংসিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জোনাইডাঙ্গা এলাকায় নির্মিত এই কাঠের সেতুটি কয়েকদিন আগে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে ‘আব্দুল করিম সেতু’।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উলিপুর রেলস্টেশনের পাশের একটি ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর একমাত্র যাতায়াতের পথ ছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জোনাইডাঙ্গা, ভদ্রপাড়া, কাঠাখালীসহ আশপাশের হাজারো মানুষ—স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রোগী ও শ্রমজীবীরা প্রতিদিন ওই সেতু দিয়ে চলাচল করতেন। সেতুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল প্রতিনিয়ত, যা এলাকাবাসীর জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই দুর্ভোগ চোখে পড়ে সাধারণ মানুষ আব্দুল করিমের। পেশায় তিনি কখনো ভ্যানচালক, কখনো দারোয়ান, কখনো কুলি—এভাবেই জীবিকা নির্বাহ করেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন সময়ের উপার্জন থেকে সঞ্চয় করেন একটি অংশ। অবশেষে এলাকাবাসীর কষ্টের কথা বিবেচনা করে প্রায় দেড় লাখ টাকা জমিয়ে শুরু করেন সেতু নির্মাণের কাজ।
এত অল্প টাকায় কাজ সম্পন্ন হবে না জেনেও তিনি থেমে থাকেননি। পরে অর্থের ঘাটতি পূরণে নিজের শখের মোটরসাইকেল ও বাড়িতে লালন করা ছাগলসহ ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করেও তিনি সেতুর কাজ সম্পন্ন করেন। উদ্বোধনের পর থেকেই এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক আনন্দ দেখা যায়, এবং তারা আব্দুল করিমকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
এ বিষয়ে আব্দুল করিম বলেন, প্রতিদিন দেখতাম মানুষ কত কষ্ট করে রেলের সেতু দিয়ে চলাচল করছে। অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটত। এলাকায় অনেক জনপ্রতিনিধি থাকলেও কেউ উদ্যোগ নেননি। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য কিছু করার চেষ্টা করেছি।
এলাকাবাসী এনামুল, বাবলু ও আজিজুলসহ অনেকে জানান, আগে এই পথে চলাচল ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন সেতু নির্মাণের ফলে এখন যাতায়াত অনেক সহজ ও নিরাপদ হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, রোগী ও শ্রমজীবীদের জন্য এটি বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। বর্তমানে এলাকার প্রতিটি মানুষই আব্দুল করিমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
সেতুপাড়া এলাকার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা সমিরন ও গৃহবধূ আকলিমা জানান, আগে অসুস্থ অবস্থায় রেলসেতু পার হতে খুব কষ্ট হতো। এখন এই কাঠের সেতু নির্মাণ হওয়ায় তাদের অনেক উপকার হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সমাজে অনেক বিত্তবান ব্যক্তি থাকলেও সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে কেউ এগিয়ে আসেননি। সেখানে একজন দিনমজুর হয়েও আব্দুল করিম যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়।
মানবিকতা, ত্যাগ ও দায়বদ্ধতার এই গল্প শুধু একটি সেতু নির্মাণের কাহিনি নয়; এটি এক মহান হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি, যা সমাজে দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।
