আগাম আমনে বদলেছে উত্তরের কৃষি অর্থনীতি

শাহেদ আলী ইরশাদ, ঢাকা ও নজরুল মৃধা, রংপুর

স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রচলিত জাতের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ দিন আগে ধান কাটতে পারায় একই জমিতে অতিরিক্ত ফসল চাষের সুযোগ পাচ্ছেন কৃষক। এতে জমির ব্যবহার, কৃষিশ্রমের চাহিদা ও কৃষকের আয় বাড়ছে। একসময় সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মৌসুমি খাদ্যসংকটে ভোগা রংপুর অঞ্চলে এই পরিবর্তন গ্রামীণ জীবন-জীবিকায়ও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত স্বল্পমেয়াদি জাতের সম্প্রসারণের ফলে অনেক কৃষক এখন বছরে তিনটি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চারটি ফসল উৎপাদন করছেন। আগাম আমন কাটার পর একই জমিতে আলু, ফুলকপি, টম্যাটো, মরিচ, সরিষা ও অন্যান্য রবিশস্য চাষ করছেন তাঁরা। ফলে আগে যে সময় জমি পতিত থাকত, তা এখন উৎপাদনে কাজে লাগছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলা-রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে ৬ লাখ ২১ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি জাতের চাষ হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪২২ হেক্টরে, যা মোট জমির প্রায় ২৫ শতাংশ। পাঁচ বছর আগে এ হার ছিল ২০ শতাংশ। কৃষি কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত আমন ধান পাকতে ১৩৬ থেকে ১৫৫ দিন লাগে। স্বল্পমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে সময় লাগে ১০০ থেকে ১২০ দিন। প্রচলিত জাতের হেক্টরপ্রতি ফলন ৪ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৫ টন এবং স্বল্পমেয়াদি জাতের ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ দশমিক ৬ টন। তবে ফলন জাত, জমি, আবহাওয়া ও চাষপদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। রংপুর বিভাগের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৈয়দা সিফাত জাহান বলেন, আগে যেসব কৃষক বছরে দুটি ফসল ঘরে তুলতেন, তাঁদের অনেকেই এখন তিনটি ফসল উৎপাদন করতে পারছেন। আগাম আমন কাটার পর জমিতে শীতকালীন ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে কৃষকের আয়ের সুযোগ : কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া গ্রামের কৃষক আহাদ আলী এ পরিবর্তনের সুফল পাচ্ছেন। এ বছর তাঁর ৯ বিঘা জমির মধ্যে তিন বিঘায় স্বল্পমেয়াদি আমন চাষ করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে ধান কাটার পরপরই ওই জমিতে ফুলকপি, টম্যাটো ও মরিচ চাষের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। ৫০ বছর বয়সি আহাদ আলী বলেন, এখন প্রায় এক মাস আগে আমন ধান কাটা যায়। এরপর শীতকালীন সবজি চাষ করা সম্ভব হয়। একই জমিতে অতিরিক্ত ফসল ফলানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় আয়ও বাড়ছে। লালমনিরহাটের কর্ণাপুর গ্রামের কৃষক রঞ্জিত দেবনাথ আট বিঘা জমির মধ্যে দুই বিঘায় আগাম পাকে এমন আমন ধান চাষ করেছেন। ধান কাটার পর ওই জমিতে ফুলকপি চাষের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। আট বছর ধরে এ পদ্ধতিতে চাষ করছেন ৬৫ বছর বয়সি এ কৃষক। রঞ্জিত দেবনাথ জানান, গত বছর দুই বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করে তাঁর ৯০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর লাভ ১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। আগাম আমনের অর্থনৈতিক সুবিধা শুধু ধানের ফলনে সীমাবদ্ধ নয়। জমি দ্রুত খালি হওয়ায় কৃষক পরবর্তী ফসলের বাজার ধরতে পারেন। তবে বীজ, সার, সেচ, শ্রম, উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের ওপর প্রকৃত মুনাফা নির্ভর করে। মঙ্গা মোকাবিলা থেকে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি : উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা মোকাবিলার লক্ষ্যে ২০০৫ সালে ব্রি ধান-৩৩-এর পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়। ব্রির সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও অ্যাগ্রোনমি বিভাগের প্রধান মো. আবদুল মজিদ এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন। পরের বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রি ও কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে চাষ সম্প্রসারণে কাজ করে। ২০১০ সালের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এ জাতের চাষ ছড়িয়ে পড়ে। আগে দীর্ঘমেয়াদি আমন ধান অগ্রহায়ণ মাসে কাটার কারণে আশ্বিন ও কার্তিক মাসে কৃষিশ্রমিকদের কাজের সংকট দেখা দিত। অনেক পরিবারকে ধারদেনা করে চলতে হতো। আগাম ধান কাটার ফলে এখন ওই সময়েই ধান কাটা, মাড়াই ও পরবর্তী ফসলের জমি তৈরির কাজ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান খন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা বলেন, আগাম আমন, আলু, সরিষা, শীতকালীন সবজি ও বোরো ধানের সমন্বয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বার্ষিক ধান উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে আমন থেকে। উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাষ বাড়ার প্রভাবে গত আমন মৌসুমে দেশে রেকর্ড ১ কোটি ৭৩ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


সম্ভাবনার পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা : বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত ফসলের নিবিড়তা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিকে বহুমুখী করার সুযোগ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ কার্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞানী শরীফ আহমেদ বলেন, দুই ধান চাষের মধ্যবর্তী সময়ে সরিষা, মুগডাল ও মসুরডালের মতো ফসল উৎপাদন করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করা সম্ভব। তবে সব এলাকার জন্য স্বল্পমেয়াদি আমন সমান উপযোগী নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, জমির অবস্থা ও ফসলের ধরন অঞ্চলভেদে ভিন্ন। রোপণের মৌসুমে পানির স্তর উঁচু থাকলে কিছু এলাকায় এসব জাতের চাষ কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ওয়াইস কবিরের মতে, মাটির ধরন ও আবহাওয়া বিবেচনায় উপযুক্ত জাত নির্বাচন এবং রোপণের সময় সমন্বয় জরুরি। আকস্মিক বন্যা ও মাটির লবণাক্ততাজনিত ক্ষতি মোকাবিলাতেও উপযোগী স্বল্পমেয়াদি জাত ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে অঞ্চলভিত্তিক জাত নির্বাচন, মানসম্মত বীজ সরবরাহ, কৃষি পরামর্শ ও পরবর্তী ফসলের বাজার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ ও কৃষকের নিট আয় নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি আমনের সাফল্য তাই শুধু ধান উৎপাদন বাড়ানোর গল্প নয়; এটি জমির অব্যবহৃত সময়কে উৎপাদনে কাজে লাগানো, কৃষিশ্রমের সুযোগ বাড়ানো এবং কৃষকের আয়ের নতুন পথ তৈরির একটি দৃষ্টান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights