আতঙ্কে জেলে বাওয়ালি; ফের বনদস্যুদের মাথা চাড়া

পশ্চিম সুন্দরবনে বনদস্যুদের আনাগোনা বেড়েছে। জেলে-বাওয়ালিদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। দস্যুদের তৎপরতা বন্ধে পুলিশ, কোস্টগার্ড ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বন কর্মকর্তারা। সুন্দরবন ঘুরে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সামছুজ্জামান শাহীন খুলনা, শেখ আহসানুল করিম বাগেরহাট ও মনিরুল ইসলাম মনি সাতক্ষীরা

গত দুই মাসে খুলনার কয়রা, দাকোপ, সাতক্ষীরা কৈখালী ও শ্যামনগরে মুক্তিপণের দাবিতে কমপক্ষে ২০ জেলেকে অপরহণের ঘটনা ঘটে। জানা যায়, বনের কয়েকটি স্থানে নৌকাপ্রতি টোকেন ফি আদায় করছে বনদস্যুরা। টাকা না দিলে মুক্তিপণ চেয়ে জেলেদের অপহরণ করা হয়। টোকেন ছাড়া মাছ ও কাঁকড়া আহরণ সম্ভব না। ১৫ ডিসেম্বর সুন্দরবনে পুষ্পকাটি মেটে খাল থেকে কাঁকড়া ধরার সময় মুক্তিপণের দাবিতে দুই জেলেকে অপহরণ করে বনদস্যু মজনু বাহিনী। শারীরিক নির্যাতনের পর ১ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেওয়া হন। ১৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা রেঞ্জে তিন জেলে ও ৮ নভেম্বর মালঞ্চ নদে খুলনার কয়রার দুই জেলে অপহরণ হয়। এ ছাড়া বনদস্যুর পরিচয়ে চাঁদা চেয়ে প্রায়ই সুন্দরবনের মাছ ব্যবসায়ীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। খুলনার দাকোপ সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির জানান, হঠাৎ করেই বনদস্যু বাহিনী মাথা চাড়া দিয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর কালাবগি এলাকায় অহিদুল শেখ নামে এক জেলে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফেরে। তাকে সুন্দরবনের শরবতখালী খাল থেকে অপহরণের পর মারপিট করে রক্তাক্ত অবস্থায় ট্রলারে বেঁধে রাখে দস্যু বাহিনী। ১২ নভেম্বর দাকোপের ঠাকুরবাড়ি ঘাট থেকে দুটি এক নলা বন্দুক ও চার রাউন্ড কার্তুজসহ বনদস্যু আসাবুর সানা ও সহযোগী আলমগীর মীরকে গ্রেপ্তার করে কোস্টগার্ড।

পশ্চিম বনবিভাগ খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগী জেলে-বাওয়ালিরা সরাসরি কেউ অভিযোগ দেয়নি। তারপরও টহল ফাঁড়িকে সতর্ক থাকার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সাতক্ষীরা রেঞ্জে সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান জানান, বনবিভাগের পক্ষ থেকে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পুলিশ, কোস্টগার্ড ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানের চিন্তা-ভাবনা চলছে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে জানান খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মো. সাজ্জাদুর রহমান।

সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জে গত আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১৬ জেলে অপহরণের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১০ জেলেকে উদ্ধার করে বনবিভাগ। বাকিরা মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তবে বেসরকারিভাবে এর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। নানা কারণে সব ঘটনা বন বিভাগের কাছে আসছে না। নতুন নতুন ডাকাত দলকে বনের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখার কথা জানিয়েছেন পর্যটক ও স্থানীয় বনজীবীরা।

গত ৪ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান, রবিউল, ইমতিয়াজসহ চার শিক্ষার্থী সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন। তারা শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী থেকে বাবুর্চি, নৌকার মালিক জাহাঙ্গীরসহ মোট আটজনকে সঙ্গে নিয়ে ৬ নভেম্বর কলাগাছি ও মালঞ্চ নদী দিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণে বের হন। সন্ধ্যার আগে মালঞ্চনদীতে পৌঁছাতেই বনদস্যু মজনু বাহিনীর এরিয়ায় ঢুকে পড়ায় বিপাকে পড়েন তারা। নৌকার মাঝি জাহাঙ্গীরের সঙ্গে স্থানীয় ডাকাত সরদার মজনু বাহিনীর পরিচয় থাকায় সে যাত্রায় রেহাই মেলে তাদের। নৌকার মাঝি জাহাঙ্গীর জানান, বনদস্যু মজনু বাহিনীর প্রধান মজনু ফোন করে ওই দিন দ্রুত তার এলাকা ত্যাগ করতে বলেন। মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা ও বনদস্যুদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া জেলেদের কাছ থেকে জানা যায়, খুলনার কয়রা, দাকোপ ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত পশ্চিম সুন্দরবনে আসাবুর বাহিনী, শরীফ বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, মজনু বাহিনী, দয়াল বাহিনী নামে বনদস্যুদের নতুন কয়েকটি দল তৎপরতা শুরু করেছে।

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ঝাপসি এলাকায় মুক্তিপণের দাবিতে ১০ জেলেকে অপহরণ করে শরিফুল বাহিনীর সদস্যরা। পরিবারের সদস্যরা ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনে। সুন্দরবনে ১ সেপ্টেম্বর থেকে টানা ৯ মাস পর্যটন মৌসুম। তবে, করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও পর্যটন কেন্দ্র, হারবাড়িয়া, শরণখোলাসহ লোকালয়ের কাছে বনে সারা বছরই পর্যটনের সুযোগ থাকে।

প্রতি বছর গড়ে প্রায় দুই লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করলেও ফের দস্যুতা শুরু হওয়ায় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে ইকোট্যুরিজম। সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকি ও নদী-খাল থেকে মাছ-কাঁকড়া আহরণের জেলে, ছন-গোলাপাতা ও মধু সংগ্রহকারী মৌয়ালসহ বনজীবীরা এখন বনদস্যুদের মুক্তিপণ আদায়ের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। বনদস্যুরা বাঘ-হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারে নেমে পড়লে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম জানান, সুন্দরবনে ফের দস্যুতা শুরুর খবরটি বন বিভাগকে ভাবিয়ে তুলেছে। দমন করতে বনরক্ষীদের পাশাপাশি বন বিভাগ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করেছে। ২০১৬-২০১৮ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights