‘আমাদের কন্যারা মহাকালের বুকজুড়ে অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাক প্রতিমুহূর্তে’

ফারজানা শারমিন পুতুল
বহুদিন পর একলা ট্রাভেল করছি নাযাহকে নিয়ে। ম্যানিলা কনফারেন্স শেষে এখন দেশের পথে। কানেক্টিং ফ্লাইটে মালয়েশিয়া থেকে ঢাকার টিকিট না পাওয়ায় ওর বাবা কিছু কাজ শেষ করতে মালয়েশিয়া রয়ে গেল। ডাক্তারের নির্দেশে এখনো কিছুটা সাবধানে চলাফেরা করতে হয় আমাকে। ভারী কিছু ওঠানো নিষেধ। এয়ারপোর্টে চেকইন, বোর্ডিং এবং লাগেজ ক্যারি—সব কাজই সে আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে করতে চায়। ভারী ব্যাগ-প্যাক উঠাতে গিয়ে তার ধমকও খেলাম একবার।

আজ থেকে বছর দশেক আগে কোনো এক শীতের দুপুরে বিক্ষিপ্ত মনে আমার দেড় বছরের নাযাহকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছিলাম। ভীষণ জ্বরে মেয়েটা কাবু হয়ে বুকের মাঝে লেপটে ঘুমিয়ে ছিল। ২০১৬ সালে আব্বুর চলে যাওয়া- আমার এবং আমাদের জীবনকে ভীষণ কঠিন পরীক্ষার মাঝে ফেলে দিয়েছিল। প্রতিদিনের ভেঙে পড়া আর উঠে দাঁড়ানোর পাওয়ার হাউজ হয়ে আমার শক্তি জুগিয়ে যেত তখন এই ছোট্ট প্রাণটি। যার বুকে কান পেতে আমি হৃদস্পন্দন শুনতাম। আর ভাবতাম, ঘরের বাইরের এই কঠিন পৃথিবীর জন্য ওকে গড়ে তুলতে হবে।

ঢাকা পৌঁছে বাসায় যেতে মাঝরাত পার হয়ে যাবে। সকাল ৯টা ৩০টায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের সরকারি অনুষ্ঠানসহ বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ করতে হবে। সারা বিশ্ব পালন করবে বিভিন্ন আয়োজনে, প্রতিপাদ্য নিয়ে আলোচনা হবে। আমাদের কন্যারা তাঁদের স্বকীয়তা নিয়ে, তাঁদের নিজস্বতা নিয়ে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠুক—সেই প্রত্যয় ব্যক্ত হবে সভায়, সেমিনারে, মঞ্চে। অথচ চোখ বুজে যখন তনু, আছিয়া, রামিসা আর তাজমিনদের কথা ভাবি, তখন কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসে। তাঁদের জন্য নিরাপদ দেশ আমরা দিতে পারিনি এখনো, এ আমাদের চরম ব্যর্থতা। আগুন লাগলে দেবালয় এড়ানো যায় না। একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

মুঠোফোন থেকে চোখ তুলে পাশে তাকিয়ে দেখি, নাযাহ তাকিয়ে আছে আমার দিকে। গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘কী করছো অন্ধকারে?’ আমি হেসে বললাম, ‘তোমাকে নিয়ে লিখছি।’ কিছুটা অবাক হলো। বললাম, ‘আজ কন্যাশিশু দিবস, তাই তোমাকে নিয়ে লিখতে ইচ্ছে হলো।’ তার প্রশ্ন, ‘এক দিনের জন্যই লিখবে?’ কী গভীর এক জিজ্ঞাসা, কত অবলীলায় ছুঁড়ে দিল সে! স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ!

একটি দিবস নয়, আমাদের কন্যারা মহাকালের বুকজুড়ে তাঁদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাক প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাতের ওষুধ খেয়েছি?’ কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে সে মুচকি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, খেয়েছো’…..

লেখক : সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights