এআইয়ের দৌড়ে স্কটল্যান্ডে ডেটা সেন্টারের হিড়িক, কেন এত বিতর্ক?

অনলাইন ডেস্ক

আপনি যখন চ্যাটজিপিটি-কে কোনও প্রশ্ন করেন, গুগলের এআই-সারাংশ পড়েন কিংবা অনলাইনে ব্যাংকিং লেনদেন করেন- এসব কাজের পেছনে নীরবে কাজ করে কোনও না কোনও ডেটা সেন্টার। বিশ্বের ডিজিটাল অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্ফোরক বিকাশের ফলে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। স্কটল্যান্ডও এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাইরে নয়। সেখানে এখন অন্তত ২৩টি বিশাল আকারের, এআই-নির্ভর ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সমর্থকদের দাবি, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও অর্থনীতির জন্য এসব ডেটা সেন্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোতে বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ আসতে পারে এবং তৈরি হতে পারে হাজার হাজার কর্মসংস্থান।

তবে বিরোধীদের উদ্বেগও কম নয়। তাদের প্রশ্ন- এত বিশাল স্থাপনা স্থানীয় জনজীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে? বিপুল বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারের চাপ কীভাবে সামলানো হবে? আর হাজার হাজার সার্ভার ও কুলিং ব্যবস্থার অবিরাম শব্দ স্থানীয় মানুষের জীবন ও বন্যপ্রাণীর ওপর কী প্রভাব ফেলবে?

এ কারণেই স্কটল্যান্ডে ডেটা সেন্টার নির্মাণ এখন শুধু প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়; এটি অন্যতম বড় পরিকল্পনা ও পরিবেশগত বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

ডেটা সেন্টার আসলে কী?
বাইরে থেকে একটি ডেটা সেন্টার দেখতে অনেকটা কারখানা বা বিশাল গুদামের মতো। কিন্তু ভেতরে থাকে হাজার হাজার কম্পিউটার সার্ভার। সার্ভারগুলোর অসংখ্য আলো জ্বলতে থাকে এবং সেগুলো ঠান্ডা রাখতে সার্বক্ষণিক চালু থাকে শক্তিশালী ফ্যান ও অন্যান্য কুলিং ব্যবস্থা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার প্রশিক্ষণ, তথ্য সংরক্ষণ, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং অনলাইন সেবার বিপুল পরিমাণ ডেটা এসব সার্ভারের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়।

অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিজেরাও ডেটা সেন্টার নির্মাণ করে। আবার কিছু উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান তাদের স্থাপনায় কী ধরনের কম্পিউটিং কার্যক্রম চালানো হবে, তা বাণিজ্যিক গোপনীয়তার কারণে প্রকাশ করতে চায় না।

স্কটল্যান্ডের বর্তমান ডেটা সেন্টারগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট। কিন্তু প্রস্তাবিত ‘হাইপারস্কেল’ ডেটা সেন্টারগুলো হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার।

৮৪টি ফুটবল মাঠের সমান একটি ডেটা সেন্টার
স্কটল্যান্ডের ফাইফের অখটারটুল এলাকায় প্রস্তাবিত একটি ডেটা সেন্টারের আয়তন হবে প্রায় ৬০ হেক্টর বা ১৫০ একর। অর্থাৎ এটি প্রায় ৮৪টি ফুটবল মাঠের সমান বড় এলাকাজুড়ে তৈরি হবে।

আরও বড় প্রকল্পের পরিকল্পনাও রয়েছে। ডামফ্রিস অ্যান্ড গ্যালোওয়ের চ্যাপেলক্রস এলাকায় প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারটি বাস্তবায়িত হলে এর বিদ্যুৎ ধারণক্ষমতা হবে ১ হাজার মেগাওয়াট। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ডেটা সেন্টারে পরিণত হতে পারে।

ফাইফের অখটারটুলে প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারটির ক্ষমতা হবে ৬০০ মেগাওয়াট। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থাপনাটি পাশের গ্রামের প্রায় সমান আয়তনের হবে।

তুলনায় স্কটল্যান্ডের বর্তমান সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টার হিসেবে বিবেচিত এয়ারড্রির ডেটাভিটা সাইটটির ক্ষমতা প্রায় ১২ মেগাওয়াট।

অর্থাৎ প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পগুলোর আকার বর্তমান অবকাঠামোর তুলনায় কয়েক গুণ, এমনকি বহু গুণ বড়।

বিদ্যুৎই বড় উদ্বেগ
ডেটা সেন্টার নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা। এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য হাজার হাজার শক্তিশালী সার্ভারকে সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হয়।

স্কটল্যান্ডে ডেটা সেন্টার নির্মাণের অন্যতম আকর্ষণ হলো দেশটির শক্তিশালী নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করে স্কটল্যান্ড।

তবে এখানে একটি জটিলতা রয়েছে। স্কটল্যান্ডের গ্রিডের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় উৎপাদিত বায়ুবিদ্যুতের একটি অংশ সব সময় যেখানে প্রয়োজন সেখানে পৌঁছানো যায় না। ফলে কখনও কখনও উৎপাদিত বিদ্যুৎ অপচয়ও হয়। ডেটা সেন্টার নির্মাতারা যুক্তি দিচ্ছেন, এসব স্থাপনায় সেই অতিরিক্ত বিদ্যুতের একটি অংশ ব্যবহার করা সম্ভব।

তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা হলো, এর অর্থ এই নয় যে ডেটা সেন্টারগুলো সব সময় শুধু নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে। বাতাস কম থাকলে বা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে চাহিদা মেটাতে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে হতে পারে।

পানির ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ
বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি বড় ডেটা সেন্টারের আরেকটি বড় চাহিদা হলো পানি। হাজার হাজার সার্ভার একসঙ্গে চললে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বড় ধরনের কুলিং ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়, যার জন্য বিপুল পরিমাণ পানি লাগতে পারে।

প্রযুক্তি খাত অবশ্য আরও দক্ষ কুলিং ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার যখন দেশকে এআইয়ের ক্ষেত্রে ‘বিশ্বনেতা’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, তখন পানি সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একজন বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি দাবি করেছেন, স্কটল্যান্ডের বর্তমান ডেটা সেন্টারগুলো প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করে, তা দেশটির লাইব্রেরিগুলোর দৈনিক ব্যবহারের চেয়েও কম। তবে উদ্বেগের মূল জায়গা হলো প্রস্তাবিত হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারগুলো চালু হলে পানির ব্যবহার কতটা বাড়তে পারে।

সার্ভারের শব্দেও উদ্বেগ
ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার সার্ভার ঠান্ডা রাখতে বিপুলসংখ্যক ফ্যান ও কুলিং সিস্টেম সার্বক্ষণিক চালু থাকে। ফলে সেখান থেকে একটানা গুঞ্জন বা যান্ত্রিক শব্দ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারের আশপাশে বসবাসকারী কিছু মানুষ এমন অবিরাম শব্দের অভিযোগ করেছেন। এর পাশাপাশি শব্দের কারণে বন্যপ্রাণীর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।

স্কটল্যান্ডে প্রস্তাবিত বিশাল ডেটা সেন্টারগুলো তাই শুধু বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা এবং পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এত বড় প্রকল্পের সুবিধা কী?
ডেটা সেন্টারের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি হলো, এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে এই অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে স্কটল্যান্ড বৈশ্বিক এআই অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। এর সঙ্গে আসবে বিপুল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান।

ল্যানার্কশায়ারকে যুক্তরাজ্য সরকার এআই গ্রোথ জোন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগের কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে রয়েছে ডেটা সেন্টার।

জানুয়ারিতে এই উদ্যোগ ঘোষণার সময় প্রায় ৮ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ এবং ৩ হাজার ৪০০টি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

তবে এসব চাকরির ধরন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। প্রায় ৮০০টি চাকরি এআই খাতে তৈরি হওয়ার কথা, যার মধ্যে ৫০টি শিক্ষানবিশ পদ। বাকি চাকরিগুলোর বড় অংশই নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত হবে।

স্কটল্যান্ডে প্রস্তাবিত ১০টি হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান আপাতুরা তাদের পরিবেশবান্ধব অবস্থানের ওপর জোর দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ সুবিধার সঙ্গে সংযোগের কারণে এসব প্রকল্প তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধবভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

এআই প্রতিযোগিতার সঙ্গে জড়িয়ে রাজনীতি
ডেটা সেন্টার নিয়ে বিতর্কের পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যখন বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন যুক্তরাজ্যও এই দৌড়ে পিছিয়ে থাকতে চায় না।

স্কটিশ সরকারও এআই গ্রোথ জোনে বিনিয়োগকে সমর্থন করছে। আগস্টে সরকার ঘোষণা করে, ৫০ মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের বিষয়ে মন্ত্রীদের অবহিত করতে হবে।

এর এক মাস পর স্কটিশ গ্রিনস পার্টি বড় ডেটা সেন্টারের আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার দাবি জানায়। দলটির যুক্তি, নতুন জাতীয় নির্দেশিকা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদন করা উচিত নয়।

তবে সরকার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, বড় কোনো ডেটা সেন্টারকে ক্রিসমাসের আগে অনুমোদন দেওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’। একই সঙ্গে বছরের শেষ নাগাদ নতুন নির্দেশিকা প্রকাশের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নাকি পরিবেশের নতুন চাপ?
স্কটল্যান্ডে ডেটা সেন্টার নিয়ে বিতর্ক শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে- এআইয়ের দ্রুত বিকাশের জন্য কতটা অবকাঠামো প্রয়োজন এবং সেই অবকাঠামোর পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য কতটা গ্রহণযোগ্য?

সমর্থকদের কাছে এগুলো ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অপরিহার্য অবকাঠামো, যা বিপুল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীদের আশঙ্কা, বিশাল আকারের এসব স্থাপনা স্থানীয় পরিবেশ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানির ব্যবহার ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।

ফলে স্কটল্যান্ডে ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রশ্নটি এখন আর শুধু প্রযুক্তি উন্নয়নের বিষয় নয়; বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি করা হবে- সেই বড় বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights