কে এই নাভি পিল্লে, যিনি পেলেন ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার

অনলাইন ডেস্ক

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের সময় রাজনৈতিক বন্দি ও অধিকারকর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াই দিয়ে কর্মজীবন শুরু। এরপর রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন। দীর্ঘ এই পথচলায় আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লে।

শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাঁর নাম ঘোষণা করে। কমিটির ভাষ্য, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ৮৫ বছর বয়সী পিল্লে দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজ্ঞ ও সাবেক বিচারক। তাঁর কর্মজীবনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ও ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই।

বর্ণবৈষম্যের দেশে বেড়ে ওঠা

নাভি পিল্লের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। তাঁর পরিবার ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত। বর্ণবৈষম্যভিত্তিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠার সময় তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে বৈষম্য ও নানা সামাজিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়।

পরিবারের আট সন্তানের একজন পিল্লে ন্যাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে স্নাতক ও আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর আইন পেশায় যুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে ন্যাটাল প্রদেশে আইনজীবী হিসেবে নিজের চর্চা শুরু করেন তিনি। ওই প্রদেশে আইন পেশায় যুক্ত হওয়া প্রথম নারী ছিলেন পিল্লে। বর্ণবৈষম্যের কারণে যাঁরা আইনি ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে নেন।

কর্মজীবনের শুরুর দিকে বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন পিল্লে। কারাগারে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও সামনে আনেন। রবেন দ্বীপের কারাগারে আটক রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় তাঁর আইনি ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর ১৯৯৫ সালে তিনি দেশটির হাইকোর্টে ভারপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পান। ন্যাটাল প্রদেশে হাইকোর্টের বিচারক হওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী ছিলেন তিনি। আইন পেশা ও বিচারাঙ্গনে তাঁর এই অগ্রযাত্রা সে সময়ের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

দক্ষিণ আফ্রিকার আদালতে কাজ করার পর পিল্লের কর্মজীবন আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় বিস্তৃত হয়। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তাঁকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নির্বাচিত করে। সেখানে তিনি আট বছর দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চার বছর ছিলেন ট্রাইব্যুনালের সভাপতি।

১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যার বিচার করতে এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। গণহত্যা ও সংঘাতের সময় যৌন সহিংসতার বিচার এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে পিল্লের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক আকায়েসু মামলায় ধর্ষণকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচনার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। এ রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ও সংঘাতের সময় যৌন সহিংসতার বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে আছে। একই সঙ্গে বিদ্বেষমূলক প্রচার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিষয়েও ট্রাইব্যুনালের আইনি সিদ্ধান্তের বিকাশে তাঁর অবদান ছিল।

পিল্লের কাজের তাৎপর্য এখানেই যে, তিনি শুধু অপরাধের বিচার নয়, সংঘাতের মধ্যে নারী ও নির্যাতনের শিকার মানুষের অভিজ্ঞতাকেও আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় গুরুত্ব দিতে সহায়তা করেছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে জাতিসংঘে

২০০৩ সালে পিল্লে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। সেখানে তিনি আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত আদালতে কাজ করার পর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য পদ ছাড়েন।

২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ পদে ছিলেন তিনি। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্য ও নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্রবহির্ভূত পক্ষগুলোর জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেন পিল্লে।

জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনের আগে ও পরে নারী অধিকার নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। ১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক নারী অধিকার সংগঠন ‘ইকুয়ালিটি নাউ’ প্রতিষ্ঠায় সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যুক্ত ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানে জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম ও যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করার সমতাবিষয়ক বিধান অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগেও তাঁর ভূমিকা ছিল।

মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি আইনশাস্ত্রে উচ্চতর গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি অর্জন করেন। হার্ভার্ড থেকে আইনশাস্ত্রে ডক্টরেট অর্জনকারী প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবেও তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়।

এখনো যুক্ত আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নিয়ে

জাতিসংঘের হাইকমিশনারের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত রয়েছেন পিল্লে। তিনি আন্তর্জাতিক মৃত্যুদণ্ডবিরোধী কমিশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় অ্যাড হক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

২০২৫ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শান্তি পুরস্কার পান। মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, নারীর অধিকার এবং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় নির্ধারণে দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ওই পুরস্কার দেওয়া হয়।

কেন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন?

নোবেল কমিটির মূল্যায়নে, পিল্লের কাজের অন্যতম দিক হলো আন্তর্জাতিক আইনকে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, গুরুতর অপরাধের দায় নির্ধারণে আইনি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নোবেল কমিটির মতে, পিল্লে বিভিন্ন দায়িত্বে থেকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে আইনের শাসন এবং ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। এ বছর পুরস্কারটির ১২৫ বছর পূর্তিও হচ্ছে। ১৯০১ সালে প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, সংঘাত নিরসন ও মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এ সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।

ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত হলেও নাভি পিল্লে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক। বর্ণবৈষম্যের শিকার একটি পরিবার থেকে উঠে এসে দেশটির আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও জাতিসংঘের শীর্ষ মানবাধিকার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাঁর নোবেল জয় তাই শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় মানবাধিকার ও জবাবদিহির গুরুত্বেরও স্বীকৃতি।

সূত্র: নোবেল পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইট, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর (ওএইচসিএইচআর), সিডনি পিস ফাউন্ডেশন ও *দ্য স্টেটসম্যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights