ক্রাইম জোন কুমিল্লা

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা
বুলেট বৈরাগী (৩৫)। একজন কাস্টমস কর্মকর্তা। রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসযোগে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন। গাড়িতে ঘুমিয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত স্টপেজে নামতে পারেননি। নামেন কুমিল্লা ঝাগুরঝুলি বিশ্বরোডে। মধ্যরাতে মহাসড়কে পৌঁছানোর পর তিনি একটি ছিনতাইকারী

চক্রের কবলে পড়েন। চালক ও যাত্রীবেশে থাকা ছিনতাইকারীরা তাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের পর চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী আইরিশ হিল হোটেলের পাশ থেকে তাঁর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোচিত অপ্রতিম হত্যা। ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩)। কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার বাসিন্দা এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। অপ্রতিম সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ১৯ সেপ্টেম্বর বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরদিন কোটবাড়ীর লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। আইফোনের জন্য তাকে হত্যা করা হয়।

সর্বশেষ তৃতীয় ঘটনাটি সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ড। সে কুমিল্লা মহানগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে তাজমিন বাসা থেকে বের হয়। ৭ অক্টোবর রাত ২টা ৫৮ মিনিটে সে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়ে তাকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিল, কিন্তু গভীর রাতে তার বাবা ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি তাৎক্ষণিক দেখতে পাননি। ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরাজগতপুর গ্রামের একটি ধান খেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে ৭ অক্টোবর রাতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছিল তাজমিন। চালক সুমন মিয়া (৩৫) একটি নির্জন ও অন্ধকার স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করে। চট্টগ্রাম থেকে ঘাতক সুমনকে গ্রেপ্তার এবং তাজমিনের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।

একের পর এক হত্যাকাণ্ডে শঙ্কা দেখা দিয়েছে-বুলেট, অপ্রতিম ও তাজমিনের পর এবার কার পালা? কারণ পুলিশের হিসাবেই গত ৯ মাসে কুমিল্লা জেলায় ১০৪ জন খুন হয়েছে। পাশাপাশি অসংখ্য অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ১০৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ডিসেম্বরে ৯, জানুয়ারিতে ১৪, ফেব্রুয়ারিতে ১২, মার্চে ১১, এপ্রিলে ১০, মে মাসে ১৭, জুনে ১০, জুলাইয়ে ১০ ও আগস্টে ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেপ্টেম্বরের তালিকা ১১ অক্টোবরের সভায় উপস্থাপন হতে পারে।

কুমিল্লায় জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সার্বিক অপরাধ ও মামলার সংখ্যা বেড়েছে। এক মাসে বিভিন্ন অপরাধে মামলা বেড়েছে ৭৬টি। আগস্টে জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় বিভিন্ন অপরাধে ৫৮৫টি মামলা হয়েছে। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৫০৯টি। সম্প্রতি অপ্রতিম হত্যার পর পুলিশ কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালিয়ে ২ হাজারের বেশি কিশোরকে আটক করলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। খুন, চুরি-ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গ্রেপ্তারের পরও আইনের ফাঁক গলে অপরাধীদের কেউ কেউ ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে পাড়ামহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তৎপরতা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

তাজমিন হত্যায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিক প্রতিনিধিরা। জেলা পুলিশের সঙ্গে হাইওয়ে পুলিশেরও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন কেউ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধপ্রবণতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটনের অনুকূল পরিবেশ বিনষ্ট করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

সমাজকর্মী ও আলোকিত বজ্রপুরের সংগঠক রফিকুল্্্ ইসলাম সোহেল বলেন, ‘কুমিল্লায় অপরাধ বাড়ার কারণ এটি সীমান্তবর্তী জেলা। এখানে মাদকের আগ্রাসন রয়েছে। মাদক ঠেকানো গেলে অপরাধ কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি, জেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি-সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মানুষ অভিনয় আর শোডাউন দেখতে দেখতে ক্লান্ত।’

কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাসুক আলতাফ চৌধুরী বলেন, ‘কুমিল্লা ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝের জেলা। এখানের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ। বিভিন্ন জেলার কর্মজীবী মানুষ রয়েছে। তাই মানুষের ঘনত্ব বেশি। সঙ্গ রয়েছে মাদকের সহজলভ্যতা। পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতিও রয়েছে। যদিও তাদের জনবল ও সরঞ্জামেরও সংকট আছে। এ ছাড়া সামাজিক অনুশাসন ভেঙে পড়েছে। অপরাধ কমাতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘এখন আর ট্র্যাডিশনাল ওয়েতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এজন্য রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে। অপরাধী গ্রেপ্তার হলে অনেকে ভয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে যান না, অপরাধী খালাস পেয়ে যায়। বেরিয়ে দ্বিগুণ অপরাধ করে। এদিকে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সমাবেশকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখন চোখ বন্ধ করে বসে থাকার সময় নেই। সবাইকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।’

এসব বিষয়ে কুমিল্লা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে টহল টিম বাড়ানো হয়েছে। টানা অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ে অভিযুক্ত ২ হাজার জনকে আটক করেছি। কিশোর অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights