অপপ্রচারকারীদের রুখতে হবে

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’ চর্যাপদের একটি বহুল পরিচিত পদ। কবি ভুসুকুর লেখা চর্যাপদের এ পদটির অর্থ-কখনো কখনো নিজের গুণ-মানই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান ক্ষমতায় এসেছেন এখনো আট মাস হয়নি। এ সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি দেশ শাসনে যে সাফল্য দেখিয়েছেন তা গর্ব করার মতো। তারপরও কুচক্রীরা সরব হয়ে উঠেছে সরকারের সমালোচনায়। তাদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে তাঁর জাতিসংঘ সফর এবং সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছে পতিত সরকারের তলপিবাহকরা।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে কিছু কূটনৈতিক অনুষ্ঠান শেষে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ১১টি রাষ্ট্র এবং সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকসহ ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে গত ২৬ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার চালিয়ে বলা হলো-‘প্রধানমন্ত্রীকে নিউইয়র্কের বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি।’ যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি অপপ্রচার! এই অপপ্রচারে ’৭১ ও ’২৪-এর পরাজিত শক্তি একে অপরের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে।

দুই পরাজিত শক্তির বটবাহিনী সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে দেশ ও বিদেশ থেকে। অথচ আমাদের দেশে এসব অপপ্রচার, মিথ্যাচার কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো শাস্তিরও বিধান নেই। ফলে যে যার ইচ্ছামতো সোশ্যাল মিডিয়ায় বানোয়াট বক্তব্য দিয়ে সরকার এবং সরকারপ্রধানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় কীভাবে বা কোন পথে এসব বন্ধ করা যায়, সে বিষয়টিও ভেবে দেখা জরুরি। কারণ ৩৫ জনের ছোট একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক পৌঁছে ২৬ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরে কৃচ্ছ্রসাধনের যে নজির প্রধানমন্ত্রী স্থাপন করেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে তা একটি বিরল ঘটনা। জাতিসংঘে বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছিলেন বিশ্ব নেতাদের আকর্ষণ। কারণ সে সময় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

জাতিসংঘ সফরের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অন্যদের মতো আস্ত একটি বিমান নিয়ে শতাধিক লোকলস্করসহ দিনের পর দিন আমেরিকা ভ্রমণ করে সে দেশের বিমানবন্দরে বিমান রেখে টার্মিনাল ফি পরিশোধ করে দেশের অর্থ অপচয় না করে টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ভ্রমণ করায় দেশের অর্থ সাশ্রয় করা হয়েছে। তারপরও এক শ্রেণির মানুষ এ বিষয়ে যেসব কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করেছেন তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়।

এ অবস্থায় দেখা যাচ্ছে যে দেশের ভিতরে বসে এক শ্রেণির লোক যেমন দেশবিরোধী চক্রান্ত, ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন, তদ্রƒপ দেশের বাইরে বসেও অনেকে চক্রান্ত, ষড়যন্ত্রের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে আমাদের দেশটি যাতে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব না হয়, তজ্জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে সংঘাত সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে।

দিন কয়েক আগে ভারতীয় একটি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত একটি সংবাদে দেখতে পেলাম-আমাদের দেশ থেকে নির্বাসিত তসলিমা নাসরিন পর্যন্ত বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রে শামিল হয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমের একটি পোস্টে আমাদের দেশটিকে তিনি ‘জেহাদিস্থান’ আখ্যা দিয়ে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্বের প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘সব হিন্দুকে কী মেরে ফেলবে মুসলমানরা? আমি জানি না, কী করে হিন্দুরা বাস করছে ওই জেহাদিস্থানে।’ আর সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় মিডিয়াগুলো তাঁর অপপ্রচার লুফে নিয়ে ফলাও করে তা পুনঃপ্রচার করেছে! অথচ এ তসলিমা নাসরিনের চরিত্র সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিবহাল। যৌবনে বাংলাদেশে বসে তিনি কী করেছেন, কাকে কাকে দেহদান করেছেন-সেসব কথাই তাঁর নিজ বয়ানে লেখনীর মাধ্যমে তিনি নিজেই প্রকাশ করেছেন! তাঁর মায়ের সামনে ঘরের দরজা বন্ধ করে গাজীপুরের উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা, ঢাকার রাজপথে দেখা হওয়া কোন লেখকের সঙ্গে মালিবাগের কোন বাড়িতে গিয়ে রমনে লিপ্ত হওয়া, আবার একই ব্যক্তির সঙ্গে কাশ্মীর ভ্রমণে গিয়ে সেখানে কী কী করেছেন সে কথাও অবলীলায় নিজ হাতে তিনি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন! তা ছাড়া তিনি তাঁর জরায়ুর স্বাধীনতা দাবি করে কবিতাও লিখেছেন! অথচ সেই বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন মহিলা বর্তমানে যাঁর দেহের বাজারমূল্য নেই তিনিই কি না, ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত, ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন! এ ক্ষেত্রে এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে ভারতের মাটি এখন বাংলাদেশবিরোধী চক্রান্ত, ষড়যন্ত্রের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং তসলিমা নাসরিনের মতো নারীরাও সেই চক্রান্ত, ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য হলো ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতন বাড়িয়ে দিয়ে সেখানে মুসলিম নিধনের মতো একটি দাঙ্গা বাঁধানো এবং তাদের এজেন্ট দিয়ে আমাদের দেশেও একটি দাঙ্গা বাঁধিয়ে ভারতকে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো; অতএব সাধু সাবধান! কারণ ভারতে বসে থাকা তসলিমা নাসরিন গং এবং তাঁদের এদেশীয় এজেন্টরা কিন্তু সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে বসে আছে!

পরিশেষে বর্তমান সরকার তথা সরকারপ্রধানের প্রতি কিছু কথা বলেই লেখাটি শেষ করতে চাই। কারণ দেশের মানুষ, যারা ভোট দিয়ে সরকার গঠন করেছেন, তাঁরা সরকারি কার্যক্রমে কতটা খুশি, লাভবান, ক্ষতিগ্রস্ত বা তাঁরা কেমন আছেন ইত্যাদি বিষয়গুলোর ওপর সরকার এবং সরকারপ্রধানের সঠিক ধারণা থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে থাকা লোকজন যদি দেশের সঠিক অবস্থা প্রধানমন্ত্রীকে জানতে বা বুঝতে না দেন, তাহলে সে ক্ষেত্রে দেশবিদেশে অবস্থানরত ওত পেতে থাকা স্বার্থান্বেষী মহল যে সুযোগ গ্রহণ করবে, সে কথাটি বলাই বাহুল্য। এ অবস্থায় বর্তমান সরকারের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা কতটা অটুট আছে, সে বিষয়েও কিছু বলা প্রয়োজন। আর এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত ধারণা হলো, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা এখনো অটুট আছে। যদিও একাত্তর ও চব্বিশের পরাজিত শক্তির সমর্থকরা আমার সঙ্গে একমত না-ও হতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বলব, প্রধানমন্ত্রী সঠিকভাবেই দেশ পরিচালনা করে চলেছেন। কিন্তু তাঁর মন্ত্রিসভার কিছু সদস্য বা কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মের বিরুদ্ধে অবশ্যই জনগণের অভিযোগ আছে। তাঁদের ব্যাপারে চোখকান খোলা রাখতে হবে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। পুঁজিবাজার হলো একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, পুঁজিবাজার হলো একটি দেশের অর্থনীতির দর্পণ, যেখানে তাকালে দেশের আর্থিক বুনিয়াদ স্পষ্ট দেখতে বা বুঝতে পারা যায়। সে অবস্থায় আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের রুগ্ণ অবস্থার কারণে দেশিবিদেশি বিনিয়োগকারীরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে।

আমি একটি মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকায় সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের সেন্টিমেন্ট আমাকে স্পর্শ করে। আর সে ক্ষেত্রে চলতি বাজেটে ভাতা হিসাবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি পয়সাও বৃদ্ধি না করায় তাঁরা হতাশ। শুধু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে অল্প কিছু ভাতা বৃদ্ধি করে অন্যদের জন্য এক কপর্দকও বৃদ্ধি না করাটা দুঃখজনক। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা, যাঁদের প্রায় সবারই বয়স আশির কোঠায় এবং তাঁরা সবাই বিভিন্ন রোগে রোগাক্রান্ত। অতএব এ দুর্দিনের বাজারে চিকিৎসাসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর জন্য অল্প কিছু অর্থ হলেও তাঁদের জন্য বরাদ্দ করা উচিত বলে মনে করি।

এবারে যাঁরা আয়কর দিয়েছেন এবং দেবেন তাঁদের অনেকেরই চক্ষু চড়কগাছ। গৃহবধূসহ এমন অনেক করদাতা যাঁরা অল্পস্বল্প বাড়িভাড়া বা অন্যান্য আয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়কর দেন, তাঁদের পরিবার সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর এ যাবৎকাল ১০ শতাংশ উৎসে কর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হলেও এবারে সেই আয়ের বাকি অংশও অন্যান্য আয়ের সঙ্গে যুক্ত করায় ক্ষেত্রবিশেষে সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর ২৫-৩০ শতাংশ আয়কর আদায় করা হচ্ছে বলে দেখা গেছে! এর বিরুদ্ধেও করদাতাদের মাঝে ভীষণ অসন্তোষ লক্ষ করা গেছে। এ বিষয়ে সরকারকে নজর দেওয়ার আবেদন জানাই।

♦ লেখক : কলামিস্ট ও বীর মুক্তিযোদ্ধা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights