তিস্তায় কার্তিকেই চৈত্রের চিত্র
রেজাউল করিম মানিক, লালমনিরহাট
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার বালাপাড়া এলাকায় এক সময়ের খরস্রোতা তিস্তা নদী হেঁটে পার হচ্ছিলেন ওমর আলী। তার মতো হাজারো মানুষ খেয়াঘাট-নৌকা ছাড়াই হাঁটুপানি পেরিয়ে প্রতিদিনই নদীর চরে আবাদকৃত ফসলের দেখভাল করেন। দেশের অন্যতম নদী তিস্তার বুকে এবার কার্তিক মাসেই জেগে উঠেছে বিশাল চর। অথচ আগে চৈত্র মাসে তিস্তার মতো বড় নদীতে জাগত এমন বালুচর।
৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খরস্রোতা তিস্তা নদী সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের দার্জিলিং-জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীর ভিতর দিয়ে ১৩০ কিলোমিটার অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে। সেই চিরযৌবনা তিস্তা ক্ষীণ হতে হতে মরে যাচ্ছে। তার বুক জুড়ে খরস্রোতা জলের ধারা আর বিশেষ করে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ থেকে ভাটিতে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত নদীর এমন হতশ্রী চেহারা চোখে পড়ে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে গভীরতা না থাকায় দুকূল উপচে তিস্তাপাড়ে দেখা দেয় বন্যা। চোখের সামনেই বসতভিটাসহ ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় তিস্তাই এখন এ অঞ্চলের মানুষের অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ নদীর ওপর নির্মিত তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে এ অঞ্চলে কৃষিজমিতে যে সেচ দেওয়ার কথা, সেটাও এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেছেন, ‘বন্যা-ভাঙনসহ পানিহীন তিস্তার বহুরূপ দেখেছে এই অঞ্চলের কয়েক প্রজন্ম। তিস্তাপাড়ের মানুষের ছুটে চলার পথ কেবলমাত্র বসতভিটা আর তিস্তায় জেগে ওঠা চরের কৃষিজমি। সে কারণে আগে তিস্তা নদীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আর এমন প্রতীক্ষায় দিন শেষ হয় এ অববাহিকার কোটি মানুষের।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক গতি ঠিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজে প্রতিদিন পানির প্রয়োজন ৭ থেকে ১০ হাজার কিউসেক। সেখানে পানি পাওয়া যায় মাত্র ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ১২০০ কিউসেক। প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম ধরা হলেও নভেম্বর থেকেই নদী শুকিয়ে যায়।
উজানে ভারত ১৯৮৭ সালে গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার শুরু করলে তিস্তা অববাহিকায় নেমে আসে ঘোর অমানিশা।
লালমনিরহাট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল রায় বলেছেন, ‘এক হাজার কিউসেকের কম পানি থাকলে তিস্তা ব্যারাজের সব গেট বন্ধ করেও সেচ সুবিধা দিতে হিমশিম খেতে হয়। তখন ভাটি এলাকায় নদীতে এক ফোঁটা পানি ছাড়ারও সুযোগ থাকে না।’
