পুরান ঢাকায় ৪ শতাধিক কেমিক্যাল গোডাউন

মাহবুব মমতাজী

পুরান ঢাকায় নিমতলীর পর চুড়িহাট্টা। স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুটি ঘটনার পরও কেমিক্যালের গোডাউন স্থানান্তর করা হয়নি। পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউনগুলোর মধ্যে গ্রিন রাবার কারখানা একটি। এটি চকবাজারের সোয়ারীঘাট এলাকার কামালবাগে। ২০১৯ সালের ১২ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গঠিত টাস্কফোর্স ওই কারখানা থেকে দাহ্য পদার্থ সরিয়ে নেওয়ার জন্য সাত দিনের সময় বেঁধে দেয়। সে সময় কারখানাটি ছিল ৩০/৬ নম্বর কামালবাগ হোল্ডিং নম্বরের বাড়িতে। সম্প্রতি ওই ঠিকানায় গিয়ে সেই কারখানা পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রায় ৮টি ভবন পার হয়ে পাওয়া যায় সেই কারখানার খোঁজ। সেখানে দেখা গেছে, সেই আগের মতোই চলছে দাহ্য পদার্থ নিয়েই কারবার। তবে সেখানে মালিকের দেখা পাওয়া যায়নি। ছিলেন সেখানে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মচারীরা।

মিজানুর রহমান নামে এক শ্রমিক বলেন, সিটি করপোরেশনের টাস্কফোর্স শুধু অব্যবহৃত দাহ্য পদার্থ সরাতে বলেছিল, সব দাহ্য সরানোর জন্য বলেনি। এমন কেমিক্যালের গোডাউন পুরান ঢাকায় অন্তত ৪০০টির বেশি খোঁজ পাওয়া গেছে। এসবের কারণে আতঙ্ক নিয়েই বসবাস করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অলিগলিতে কেমিক্যালের গোডাউন থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চকবাজার, ছোট কাটরা, বড় কাটরা, কামালবাগের এবং আগামসি লেনের বাসিন্দারা। কেমিক্যালের গোডাউন সরানোর উদ্যোগের সাত বছর পরও সেগুলো আগের স্থানেই রয়ে গেছে। মোবারক নামে চকবাজারের এক বাসিন্দা জানান, এসব কেমিক্যাল গোডাউন সরানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ একবার পদক্ষেপ নিয়েছিল। পরে আবার তারা পিছিয়ে পড়ে। যেভাবে গোডাউন ছিল সেভাবেই আছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তাদের বসবাস করতে হচ্ছে।

২০১০ সালের ৩ জুন রাজধানীর পুরান ঢাকার নবাবকাটরার নিমতলীর ৪৩ নম্বর বাড়িতে রাত ৯টায় কেমিক্যালের গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ সোমবার বিকাল ৫টায় চকবাজারের ছোট কাটারায় এসি মসজিদের পাশে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগে। ভবনটির সাত তলা কাঠামোর ষষ্ঠ তলায় একটি প্লাস্টিক ব্যাগের দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।

জানা যায়, ২০১০ সালেই পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকাগুলো থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। সে সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিস রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন করে। ওই সময় সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে ১ হাজার ৯২৪ ব্যবসায়ীর তালিকা করে মন্ত্রিপরিষদ গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির কাছে হস্তান্তরও করে। পরে ওই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থায়ীভাবে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের তুলসীখালীতে কেমিক্যাল পার্ক নির্মাণ করার দায়িত্ব দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিসিককে। এরপরে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারে চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গোডাউনের আগুনে ৭৮ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় প্রশাসন কঠোরভাবে সিদ্ধান্ত নেয় পুরান ঢাকার সব কেমিক্যাল গোডাউন কেরানীগঞ্জের নির্দিষ্ট একটি স্থানে স্থানান্তর করার। চুড়িহাট্টার আগুনের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার পর চুড়িহাট্টার ওয়াহিদ ম্যানশনে বিকট শব্দে ক্যানগুলো বিস্ফোরিত হয় এবং বিস্ফোরিত জ্বলন্ত ক্যান উড়ে এসে রাস্তায়ও পড়ে। সুগন্ধী তৈরিতে ব্যবহৃত অতি দাহ্য রাসায়নিকগুলোর মধ্যে ছিল- ইথাইল অ্যালকোহল, বিউটেন, আইসো বিউটেন, প্রোপেইন, বুটোক্সি ইথানল, গাইকল ইথার, ডাইইথাইল থালেট ও প্রোপিলিন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, পুরান ঢাকায় আমরা কাউকে কেমিক্যাল ব্যবসার নতুন করে কোনো লাইসেন্স দিচ্ছি না। আর কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ একটি চলমান প্রক্রিয়া। যদি কেউ গোডাউন রেখে ব্যবসা করে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিব। পুরান ঢাকার কেমিক্যালের গোডাউনগুলোতে সরেজমিন দেখা যায়, কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি রাবার, পলিথিন ব্যাগ এবং প্লাস্টিকের দানা তৈরি হচ্ছে। এগুলো শ্রমিকদের কেউ কেউ বস্তা করে সারি সারি করে রাখছেন। কেউ সেই বস্তা ভ্যানে তুলছেন অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। আবার কেউ কেমিক্যালের খালি প্লাস্টিকের ড্রামগুলো পাশের ফাঁকা স্থানে স্তূপ করে রাখছেন।

জানা যায়, ২০১৯ সালে টাস্কফোর্স গঠনের পর পুরান ঢাকায় দাহ্য পদার্থ রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। যারা এসবের ব্যবসা করছিলেন তাদের স্থানান্তর করার শর্তে ট্রেড লাইসেন্স বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু তারা কেরানীগঞ্জ উপজেলা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কেমিক্যাল আমদানি করা শুরু করে এবং সেগুলো পুরান ঢাকাতেই বিক্রি করে আগের মতোই। ডিএসসিসির টাস্কফোর্সের তথ্যানুযায়ী পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দাহ্য পদার্থের যেসব কারখানা এবং গোডাউন পাওয়া যায়, তা হলো- আরমানিটোলার আরমানিয়ান স্ট্রিটের নুর ট্রেড হাউস, মোহসিন অ্যান্ড ব্রাদার্স, মেসার্স নোমান পারফিউমারী হাউস, ডিভাই ট্রেডলিংক, কিং সেন্ট ট্রেডিং, কেমি মার্ট, মেসার্স নয়নমনি কেমিক্যাল, ইয়ামান কেমিক্যালস পারফিউমারী, হাজী ট্রেডার্স, মোডল এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মারিয়া পারফিউমারী হাউস, এনবি কেমি কর্নার, জোহরা ট্রেডিং করপোরেশন, হাফসা এন্টারপ্রাইজ, এসআর কেমিক্যাল, মদিনা ট্রেড সেন্টার, দি ওরয়েন্ট কেমিক্যাল, ৮/১/এ নম্বর আরমানিয়ার স্ট্রিটের পরিত্যক্ত একটি বিল্ডিংয়ে কেমিক্যালের গোডাউন, বংশালের পুরানা মোগলটুলীর রোজিনা এন্টারপ্রাইজ, মালিটোলা রোডের মামুন ট্রেডার্স, চকবাজারের দেবীদাস ঘাট লেনের আলমগীর ব্যাপারী প্লাস্টিক, রাপী প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, মেসার্স বার্জার রাবার ইন্ডা. (প্রা.) লি., কুদ্দুস প্লাস্টিক, রোমানা রাবার, হাফিজ প্লাস্টিক, নাজমুল রাবার প্লাস্টিক, হান্নান মেটাল, আলমানি এন্টারপ্রাইজ, তানভীর প্লাস্টিক, সোহাগ প্লাস্টিক, নিউ পলাশ রাবার, ফ্রেম প্লাস্টিক, মেসার্স আরএফ প্লাস্টিক, সোহারীঘাট কামালবাগের হেনা এন্টারপ্রাইজ, এটলাস প্লাস্টিক এবং লোকমান প্লাস্টিক।

এদিকে ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার যেসব ভবনে কেমিক্যাল গোডাউন, দোকান ও কারখানা আছে সরকারের কাছে তার একটি তালিকা চায় হাইকোর্ট। ওই বছরের ১৭ এপ্রিলের মধ্যে এই তালিকা আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) আইনজীবী এস হাসানুল বান্না বলেন, সেই তালিকা সরকার এখনো দেয়নি। নিমতলীর ঘটনার একটি মামলায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৯০০টির একটি তালিকা দিয়েছিল। তবে সেটি আপডেট করা নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights