‘ভয় লাগছে, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো’, অবশেষে ছোট্ট রুদ্রর কান্না থামল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আইনি জটিলতা আর আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌড়ঝাঁপ পেরিয়ে অবশেষে নিজের আবেগভরা আশ্রয়ে ফিরেছে তিন বছর বয়সী শিশু রুদ্র মহেশ। নিজের বেড়ে ওঠার চেনা আঙিনা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ছোট্ট রুদ্রর এক আকুল আর্তি কেঁদে ভাসিয়েছিল বহু মানুষের হৃদয়—‌‘আম্মা, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো… আমার খুব ভয় লাগছে!’

সম্প্রতি ভারতের করিমনগরের একটি শিশুযত্নকেন্দ্রে অবুঝ শিশুটির এই কান্নার হৃদয়বিদারক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। তীব্র সামাজিক প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তীতে তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট ও জগিত্যাল জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে গত সোমবার সন্ধ্যায় আবারও সেই ভালোবাসার বাবা-মায়ের কোলেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে খুদে রুদ্রকে।

এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল একটি দত্তক নেওয়ার আইনি বৈধতাকে কেন্দ্র করে। কাসারাপু শ্রীনিবাস ও সারিতা দম্পতি ছিলেন সন্তানহীন। রুদ্রর বয়স যখন মাত্র পাঁচ দিন, তখন থেকেই তারা তাকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসেন এবং গত তিন বছর ধরে নিজেদের সন্তানের মতো লালন-পালন করে বড় করে তোলেন। ওই দম্পতির দাবি, তারা হিন্দু ধর্মীয় রীতি ও ঐতিহ্য মেনেই শিশুটিকে দত্তক নিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা এই দত্তক গ্রহণের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং শিশুটিকে জোরপূর্বক দম্পতির কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে করিমনগরের একটি সরকারি শিশু পরিচর্যাকেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন।

ভিডিওতে দেখা যায়, সেন্টারে থাকা অবস্থায় সারিতাকে দেখে শিশুটি বাড়ি ফেরার জন্য আকুল হয়ে কাঁদছিল, আর অন্যদিকে সন্তানসম রুদ্রকে এভাবে দেখে নিজেদের চোখের জল সামলাতে পারছিলেন না শ্রীনিবাস ও সারিতা দম্পতিও।

সন্তানকে ফেরত পেতে আর কোনো উপায় না দেখে আইনগত লড়াইয়ে নামেন শ্রীনিবাস ও সারিতা। তারা তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। সেখানে রিট পিটিশন নম্বর ৩১৫৮৮/২০২৬-এর প্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে আদালত একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ জারি করেন। আদালতের নির্দেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়, আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য শিশুটির জিম্মা বা হেফাজত ওই দম্পতির কাছেই পুনর্বহাল করতে হবে।

তবে আদালতের রায় হাতে পাওয়ার পরেও শেষ হয়নি দম্পতির ভোগান্তি। গত ২৮ অক্টোবর চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির (সিডব্লিউসি) কাছে হাইকোর্টের সেই আদেশ জমা দেওয়া সত্ত্বেও শিশুটিকে হস্তান্তরে অযথা দেরি করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ তোলেন তারা। বিলম্বের প্রতিবাদে ও সন্তানকে দ্রুত ফিরে পাওয়ার দাবিতে তারা আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিয়ে আবারও হাইকোর্টের দ্বারে কড়া নাড়েন এবং গত ২ নভেম্বর, সোমবার জগিত্যাল কালেক্টরেটে অনুষ্ঠিত ‘প্রজাবাণী’ অভাব-অভিযোগ নিবারণ কর্মসূচিতে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদনপত্র জমা দেন।

বিষয়টি নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়তে থাকলে এবং গণমাধ্যমের নজর কাড়লে দ্রুত নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। জগিত্যাল জেলা সংগ্রাহক (ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর) বি সত্য প্রসাদ জানান, হাইকোর্টের নির্দেশনাবলী কঠোরভাবে মেনেই শিশুটিকে তার অভিভাবকের কাছে ফেরত দেওয়া হচ্ছে। সিডব্লিউসির অনুমোদন এবং কিছু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার কারণে হস্তান্তরে কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি আশ্বাস দেন যে, সোমবার রাত অথবা মঙ্গলবার সকালের মধ্যেই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। প্রশাসনের সেই আশ্বাসের পর আর বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি, সোমবার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যার মধ্যেই রুদ্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রীনিবাস ও সারিতার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

বহু সপ্তাহের তীব্র উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর বিরহের পর শিশুটিকে ফিরে পেয়ে শ্রীনিবাস ও সারিতা দম্পতির ঘরে এখন আনন্দের বন্যা। অন্যদিকে, ছোট্ট রুদ্র মহেশ অবশেষে ফিরে পেয়েছে সেই চেনা স্পর্শ আর ভালোবাসার কোল, যার জন্য সে দিনরাত কান্নাভেজা কণ্ঠে আকুতি জানিয়ে আসছিল।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights