রিকশায় চড়া প্রধানমন্ত্রী ও কন্যাকাহিনি
সুমন পালিত
তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক। দেশের স্বাধীনতার জন্য যিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত। পাকিস্তান বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর। শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরতম গণহত্যা। চেঙ্গিস, হালাকু আর হিটলার, মুসোলিনির বশংবদ ইয়াহিয়া খানের অনুচর টিক্কা খান ও নিয়াজিরা মেশিনগান, কামান, ট্যাংক নিয়ে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তাণ্ডব চালান। বাঙালির স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা শেখ মুজিব সিদ্ধান্ত নেন তিনি তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনেই থাকবেন। তাজউদ্দীনসহ সিনিয়র নেতারা বাসভবন ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি রাজি হননি। পালিয়ে যাওয়ার বদলে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ভাগ্যবরণ করেন তিনি। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন দলের সেকেন্ডম্যান। স্বভাবতই সেই কঠিন সময়ে জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর ওপর। তবে সে দায়িত্ব পালন অত সহজ ছিল না। অসহযোগ আন্দোলনের সুবাদে সারা দেশে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন চার খলিফা নামধারী ছাত্রনেতারা। যাঁদের মধ্যে ছিলেন ডাকসুর সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আ স ম আবদুর রব এবং আবদুল কুদ্দুস মাখন। ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাজাহান সিরাজ।
এই চার খলিফার নেতা হিসেবে বিবেচিত হতেন সিরাজুল আলম খান ও শেখ ফজলুল হক মণি। বলছিলাম শেখ সাহেবের কথা। ২৫ মার্চের কালরাতেই গ্রেপ্তার হন সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর গ্রেপ্তারে দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নেতা তাজউদ্দীনের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবে তিনি হার মানার পাত্র ছিলেন না। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তখন চলছিল গণহত্যা। বিশেষ করে ঢাকায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর পাকিস্তানিরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মারণাস্ত্র নিয়ে। তাজউদ্দীন সিদ্ধান্ত নিলেন ভারতে যাবেন। সেখানে গিয়ে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের প্রস্তুতি নেবেন। দলের শীর্ষ পর্যায়ে ঐকমত্য ছিল পাকিস্তান বাহিনী শক্তি প্রয়োগ করলে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার। এ ব্যাপারে ভারতের সহায়তা পাওয়া যাবে বলেও মনে করতেন তাঁরা। তবে সবকিছুর আগে তাজউদ্দীনের জন্য নিরাপদে ঢাকা ত্যাগ আশু কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি ঢাকা ছাড়ার ও ভারতে যাওয়ার সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে। তাঁরা দুজন ঢাকায় ছদ্মবেশ ধরে দুই দিন কাটান এ আস্তানা থেকে সে আস্তানায়। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ার চুয়াডাঙ্গা হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে পৌঁছান। ঢাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত পর্যন্ত কখনো হেঁটে বা নৌকায় কখনো অন্য কোনো যানবাহন ব্যবহার করেন তাঁরা। ভারত সীমান্তে পৌঁছানোর পর তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সে দেশে যেতে চান, আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে নয়। বাংলাদেশের মাটিতে থাকতেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমীর-উল ইসলামকে তাগিদ দেন। যোগাযোগের জন্য তিনি দীর্ঘ সময় অপেক্ষাও করেন। ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়েন সীমান্তবর্তী কালভার্টের ওপর। তারপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সম্মতি পাওয়ার পর বিএসএফের আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদারের উপস্থিতিতে তাঁরা সসম্মানে ভারতের বুকে পা রাখেন। পরদিন ৩১ মার্চের প্রথম প্রহরে তাঁদের কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়।
কন্যাকাহিনিভারতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তাজউদ্দীন আহমদ। দুই নেতার বৈঠক হয় দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে। সে সময় প্রবাসী সরকার গঠনের আলোচনা হয়। তাজউদ্দীন এ ব্যাপারে ভারতের সহায়তা কামনা করেন। মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং বিপুল শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়েও তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সম্মতি আদায় করেন। তবে ভারতের জন্য বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রবাসী সরকারকে সহায়তা করা সহজ ছিল না। ‘অ্যা গ্লোবাল হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ’ বইতে শ্রীনাথ রাঘভান লিখেছেন, মিসেস গান্ধী ও তাঁর মুখ্য সচিব পি এন হাকসার একমত হন, পূর্ব-পাকিস্তানের বিষয়ে তাঁদের সাবধানে পা ফেলতে হবে। পাকিস্তান জাতিসংঘের সদস্য। সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভালোভাবে নেবে না। রাঘভানের মতে, ভারতের সর্বোচ্চ মহলের অভিমত ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পেতে শেখ মুজিব ও তাঁর সহকর্মীদের নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন তাজউদ্দীন আহমদ। অথচ সে সময় এই শীর্ষ নেতার ছিল একটি মাত্র শার্ট। যে শার্টটি ময়লা হলে তিনি রাতে নিজ হাতে ধুয়ে শুকিয়ে পরদিন গায়ে চাপাতেন। পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের সঙ্গে তাজউদ্দীনের যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে।
রিকশায় চড়া প্রধানমন্ত্রী
স্বনামধন্য আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক ও লেখক কামরুদ্দীন আহমদকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে ভাবা হয়। মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতাও ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধকালে কামরুদ্দীন আহমদকে ঢাকা জেলে বন্দি রাখে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী। তাঁর পুত্র নিজামুদ্দীন আজাদ ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর কামরুদ্দীন আহমদ জেল থেকে ছাড়া পান। জানতে পারেন তাঁর প্রিয়পুত্র নিজামুদ্দীন আজাদ আর নেই। বেতিয়ারায় গেরিলা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বীরপুত্র আজাদের শোকে ভেঙে পড়েন কামরুদ্দীন। সারা দিন পড়ে থাকতেন বাড়িতেই। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় ফিরে আসে ২২ ডিসেম্বর বুধবার। এর দুই দিন পর ২৫ ডিসেম্বর শনিবার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ গেলেন কামরুদ্দীন আহমদের বাড়িতে। সান্ত্বনা দেন সন্তানহারা পিতাকে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন একপর্যায়ে কামরুদ্দীনকে অনুরোধ করেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি পদটি গ্রহণ করার জন্য। এমন প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। মøান হেসে কামরুদ্দীন বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আমি পুত্র হারিয়েছি। আপনি কি সেই ক্ষতিপূরণের জন্য পদটি আমাকে দিতে চান?
তাজউদ্দীন বললেন, শুধু পুত্র হারানো নয়, ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে ৬ দফা প্রণয়ন এবং সব আন্দোলনে আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা অনন্য। দেশে এখন আপনার মতো যোগ্য লোকের প্রয়োজন। আমরা এ কারণেই এই প্রস্তাব দিচ্ছি। কামরুদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের অনুরোধে রাজি হলেন না। বললেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি বিধ্বস্ত। তাঁর পক্ষে এমন গুরুদায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। কথাবার্তা শেষ হলে তাজউদ্দীন বিদায়ের জন্য উঠে দাঁড়ান। তাঁকে এগিয়ে দিতে গিয়ে কামরুদ্দীন আহমদ সবিস্ময়ে দেখেন, বাড়ির বাইরে গাড়ি নয়, একটি রিকশা দাঁড়িয়ে। প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, আপনি রিকশায় এসেছেন? তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, হ্যাঁ। আজ বড়দিনের সরকারি ছুটি। গাড়ি ব্যবহার না করে তাই রিকশায় এসেছি।
কামরুদ্দীন বললেন, নিরাপত্তার কথাটি অন্তত ভাবা উচিত।
তাজউদ্দীন সে প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। মৃদু হেসে রিকশায় উঠলেন।
-এমনই ছিলেন আমাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
কন্যাকাহিনি
তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় নাম। বেগম জোহরা তাজউদ্দীনও দেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলক। এরশাদের ক্ষমতায় আসা এবং তাঁর শাসন সুসংহত করার পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখেন এক সামরিক কর্মকর্তা। তাঁর নাম মেজর মনিরুল ইসলাম চৌধুরী মুন্না। যিনি ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ ও তাঁর স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনের বড় মেয়ে শারমিন আহমদ রিপির প্রথম স্বামী। শারমিনের বাবা-মা আজীবন গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করেছেন। অথচ তাঁদের জ্যেষ্ঠ কন্যা শারমিনের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, শারমিন তাঁর প্রথম স্বামী মনিরুল ইসলামকে নানাভাবে ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে মদত জুগিয়েছেন। আর তাঁর দ্বিতীয় স্বামী একজন মিসরীয় ইসলামিস্ট নেতা।
মুন্না ছিলেন ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কর্নেল রশীদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। রিপির দ্বিতীয় স্বামী মিসরের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের ড. আমর খাইরি আবদুল্লাহ! ১৯৯৮ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম ব্রাদারহুড অভিন্ন আদর্শের দল হিসেবে পরিচিত। শারমিন আহমদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্নার নাতি তারিক রামাদানের রয়েছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তিনি ও তাঁর মিসরীয় স্বামী ড. আমর ইহুদি, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের লোকদের সঙ্গে আন্তধর্মীয় সংলাপে অংশ নেন। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে শারমিন ও তাঁর স্বামী ইহুদিদের রোশ হাশানাহ উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত ইহুদি ধর্মসভায় ইসলামি শিক্ষা সম্পর্কে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। আরব বসন্তের প্রভাবে মিসরে ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারির গণ অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতন ঘটে। সে সময় স্ত্রী শারমিনকে সঙ্গে নিয়ে আমর তাহরির স্কয়ারে হাজির হন। এ অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পান ব্রাদারহুড নেতা মোহাম্মদ মুরসি। তাহরির স্কয়ারে হাজির হতে পেরে শারমিন নিজেকে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবানদের একজন’ হিসেবে অভিহিত করেন। ব্রাদারহুড নেতা ইউসুফ আল কারজাভির ইমামতিতে ২০১১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কায়রোর তাহরির স্কয়ারে জুমার নামাজও পড়েন তিনি। এজন্য উচ্ছ্বাসও প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে তাঁর লেখা বইয়ের নাম ‘ডটার অব বাংলাদেশ লিবারেশন উইটনেস তাহরির ইমান্সিপেশন ইন ইজিপ্ট : অ্যা কান্ট্রি দ্যাট ওয়াজ রক্ড বাই অ্যা রেভল্যুশন’। বইটিতে জঙ্গি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্নার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
-যোগ্য বাবা-মায়ের অন্যরকম এক কন্যা বটে।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : sumonpalit@gmail.com
