রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি

জিন্নাতুন নূর
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চলছে চূড়ান্ত ধাপের প্রস্তুতি। এরই মধ্যে সেফটি ভালভের কারিগরি ত্রুটির সমাধান করা হয়েছে। ইউনিট-১ চালুর আগে এই অর্জন গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক।

আজ (শুক্রবার) দুপুরের মধ্যে প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম দেশে আসবে বলেও বাংলাদেশ প্রতিদিনকে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সূত্র জানায়, সেফটি ভালভে ১৬ মেগাপ্যাসকেল (এমপিএ) উচ্চ-চাপ পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পরবর্তী ধাপে প্রায় ১৮ এমপিএ চাপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে। এটি সফল হওয়ার পর ফিশন রিয়্যাকশন শুরু করা হবে। এই প্রক্রিয়া শেষে পাওয়ার স্টার্টআপে যেতে পুরো অক্টোবর মাস লেগে যাবে। আর পাওয়ার স্টার্টআপের পরেই গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার বিষয়টি আসবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আশা করা হচ্ছে আগামী নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই স্বপ্নের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত মোট বিদ্যুৎ ক্ষমতার ৩০ শতাংশ বা ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

সেফটি ভালভের কারিগরি ত্রুটির সমাধান : নিউকিøয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড সূত্রে জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট-১-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে সেফটি ভালভ হিসেবে ব্যবহৃত ‘প্রেশার অপারেটেড রিলিফ ভালভ’-এর ১৬ মেগাপ্যাসকেল (এমপিএ) উচ্চ-চাপ পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে শুরু হওয়া পরীক্ষাটি মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এবং জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ-উভয় স্থান থেকেই পরিচালনা করা হয়। এতে কন্ট্রোল ভালভগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হয় এবং সেগুলোর সন্তোষজনক পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট ‘মেইন সেফটি ভালভ’গুলোর কার্যক্রম ও সাড়া দেওয়ার বিষয়টিও পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ভালভের সাড়া প্রদান, খোলা ও বন্ধ হওয়ার কার্যকারিতা, অ্যালার্ম এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার বিভিন্ন প্যারামিটার পর্যবেক্ষণ।

সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত কার্যপদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা শর্ত কঠোরভাবে মেনে এই পরীক্ষাটি করা হয়। কাজের আগে ও কাজ চলাকালীন সময়ে যোগাযোগব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং বিকিরণ সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলোও যাচাই করা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুকরণ প্রক্রিয়ায় প্রেশার অপারেটেড রিলিফ ভালভ পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এই ব্যবস্থাটি রিঅ্যাক্টরের প্রাথমিক সিস্টেমে নিরাপদ চাপের অবস্থা বজায় রাখার সঙ্গে যুক্ত। পরীক্ষার পরবর্তী ধাপটি-অর্থাৎ প্রায় ১৮ মেগাপ্যাসকেল চাপে পরীক্ষা খুব শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া চালুর সঙ্গে জড়িত দল ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে এবং পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে প্রতিটি পর্যায় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করে নিচ্ছে।

চলছে চূড়ান্ত ধাপের কাজ : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অক্টোবরে রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত পাওয়ার স্টার্টআপে যাওয়া সম্ভব হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না যে রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রিডে যাচ্ছে। চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হতে পুরো অক্টোবর লেগে যাবে। সেফটি ভালভে ১৬ মেগাপ্যাসকেল উচ্চ-চাপ পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর এখন ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু করা হবে। এই রিফ্যাকশনের প্রক্রিয়া প্রায় তিন সপ্তাহের মতো। এই প্রক্রিয়া শেষে পাওয়ার স্টার্টআপে যেতে অক্টোবর মাস লেগে যাবে। পাওয়ার স্টার্টআপের পরে গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার বিষয়টি আসবে। পাওয়ার স্টার্টআপে না গেলে কবে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে- এটা বলা যাবে না।

এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত অন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাধারণ সম্মেলনের আগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচভকে বিজ্ঞানমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম শিডিউল অনুযায়ী রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তখন লিখাচভ আশ্বস্ত করেছিলেন যে, চলতি বছরের মধ্যেই রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যাবে।

ড. মো. কবীর হোসেন আরও বলেন, ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু হলেও সেখানে অনেক পরীক্ষা আছে। এই রিঅ্যাকশনকে স্থায়ী করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, শিডিউল অনুযায়ী রূপপুরের প্রথম ইউনিটের উৎপাদনের আসার এক বছর পর দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদনে আসার কথা। তবে এখন কাজের যে অগ্রগতি এতে দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদন এক বছর পর শুরু করা বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।

আজ দুপুরে পৌঁছাবে ইউরেনিয়াম : রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা-রোসাটমের হয়ে বাংলাদেশের পিআর সংস্থা ট্রাইউইন গ্রুপ গণমাধ্যমকে শুরু থেকেই প্রকল্পের সার্বিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত করে আসছে। এই সংস্থার একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, আমরা আশা করছি ২ অক্টোবর (শুক্রবার) দুপুরের মধ্যে রূপপুরের ইউরেনিয়াম বাংলাদেশে এসে পৌঁছাবে। প্রসঙ্গত, এর আগে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের জটিলতা থাকায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর রূপপুর প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি দেশে আসতে পারেনি। এরই মধ্যে এই জ্বালানি সংগ্রহে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে রাশিয়া থেকে সরাসরি বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজে আজ দুপুরের মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই জ্বালানি পৌঁছাবে। এরপর তা বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রূপপুর প্রকল্প এলাকা নিয়ে যাওয়া হবে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট ৭টি কার্গো এবং প্রথম ইউনিটের রিফুয়েলিংয়ের জন্য দুটি কার্গোসহ মোট ৯টি কার্গোতে এই জ্বালানি আসছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরো জ্বালানি বাংলাদেশে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে রোসাটম।

প্রসঙ্গত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণ করা হচ্ছে। কেন্দ্রটি রাশিয়ার আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহয়তায় নির্মিত হচ্ছে। সেখানে দুটি ইউনিটে ১২০০ মেগাওয়াট করে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights