সম্ভাবনা ছিল, তবুও কেন বিপর্যস্ত পাকিস্তানের পর্যটন খাত?
অনলাইন ডেস্ক
বহু দশক ধরে বিশ্বজুড়ে পর্যটন শিল্পের সাফল্য মেপে আসা হচ্ছে কিছু গতানুগতিক পরিসংখ্যান দিয়ে। কত পর্যটক এল, হোটেলগুলোতে ভিড় কেমন আর রাজস্ব আয় কত বাড়ল; হিসাবটা যেন এতদিন অত্যন্ত সোজা ছিল। কিন্তু এখন বিশ্বজুড়ে এক ভিন্ন ও বাস্তব চিত্র ফুটে উঠছে। রেকর্ড পরিমাণ পর্যটক পেয়েও বিশ্বের বহু জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র এখন চরম সংকটে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের কোনো অংশীদার ভাবতেই পারছেন না, উল্টো সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে, সাংস্কৃতিক স্থানগুলোর অবমূল্যায়ন হচ্ছে এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সংখ্যার বৃদ্ধি কোনো প্রকৃত মান তৈরি করে না। কেবল প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক পর্যটন লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে এবং স্বল্পমেয়াদি দৃশ্যমানতার পেছনে ছুটতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দেয়। যে পর্যটন ব্যবস্থা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আসে না, তা তার মূল ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। তাই ভবিষ্যতের সফল পর্যটন খাত কেবল পর্যটকের সংখ্যা বাড়াবে না বরং তা সম্প্রদায়, সংস্কৃতি ও পরিবেশের স্থায়ী ভারসাম্য রক্ষা করবে।
সংখ্যাভিত্তিক পর্যটনের এই ব্যর্থতার অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ পাকিস্তান। দেশটির প্রশাসনিক ও নীতিগত পর্যায়ে ‘পাকিস্তানের অপার পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে’ এই একটি পলিশড বাক্য বারবার আউড়ানো হলেও বাস্তবে এর কোনো ফলপ্রসূ প্রভাব দেখা যায় না। ছুটির দিন বা ঈদের মতো সময়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নজর দিলেই প্রকৃত চিত্রটি ভেসে ওঠে। পর্যটকদের চাপ ও অব্যবস্থাপনায় রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, জরুরি সেবা ভেঙে পড়ে, যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা জমে এবং পরিবেশটা কোনো নান্দনিক অভিজ্ঞতার বদলে চরম বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয়।
পাকিস্তানের মূল সমস্যা অতিরিক্ত পর্যটকদের উপস্থিতি নয় বরং কোনো দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন। যেখানে অনেকেই স্থানটির সংস্কৃতি বা পরিবেশকে সম্মান না করে কেবল আত্মপ্রচার ও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আসেন। পর্যটন স্থানগুলো আজ কেবল ক্যামেরার পেছনের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে, যার ফলে স্থানীয় সমাজ ও পরিবেশ ভীষণভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে নীতি নির্ধারণী জায়গাগুলোতে পাকিস্তানের পর্যটন সম্পর্কিত বোঝাপড়া অনেকটাই অগভীর। সভা-সমাবেশে বৈশ্বিক পরিভাষা আর ইংরেজি শব্দের ব্যবহারে ফুলঝুরি ফুটলেও বাস্তবে তা ডেটা বা স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে করা হয় না। যেন সবাই অন্যকে পরামর্শ দেওয়ার বিশেষজ্ঞ, কিন্তু পর্যটন ব্যবস্থাপনার মূল কাজের বেলায় কেউ নেই। এই ফাঁকা বুলি আর বাস্তবতার ব্যবধান পাকিস্তানের জন্য চরম ভাবমূর্তি সংকট তৈরি করছে, যা বিনিয়োগকারী ও পর্যটক উভয়ের আস্থা নষ্ট করছে।
টেকসই পর্যটন খাত গড়ে তুলতে হলে সংখ্যা নয়, মান নিশ্চিত করা জরুরি। লাখ লাখ পর্যটক এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও পরিবেশ নষ্ট করার চেয়ে কমসংখ্যক দায়িত্বশীল পর্যটক অনেক বেশি মূল্যবান, যারা দীর্ঘ সময় থাকবেন এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করবেন। পাকিস্তান যদি সত্যি পর্যটন খাতে সফল হতে চায়, তবে স্লোগান ছেড়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, পেশাদার প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে।
