‘সুইসাইড নোট’ লিখে জাবি শিক্ষার্থী নিখোঁজ, বিভাগে তালা
জাবি প্রতিনিধি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী সুইসাইড নোট লিখে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ওই শিক্ষার্থীর নাম কাজী মো. মোহাইমিনুল ইসলাম। তিনি জাবির মীর মশাররফ হোসেন হলের ৫০তম ব্যাচের আবাসিক ছাত্র।
এদিকে, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে একাডেমিক নিপীড়ন ও অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে মোহাইমিনুলকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে খুঁজে বের করা, বিভাগের সভাপতি ও ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিসহ ৭ দফা দাবিতে বিভাগে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন মোহাইমিনুলের সহপাঠীরা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রথম প্রহরে (রাত দেড়টার দিকে) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কার্যালয় থেকে এসে বিভাগের ফটকগুলোতে তালা দেন তারা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তালা খুলবেন না বলে জানিয়েছেন তারা।
নিখোঁজ মোহাইমিনুলের সহপাঠীরা জানান, স্নাতক ফাইনালে একটি কোর্সে অকৃতকার্য হলে সেটির বিশেষ পরীক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন মোহাইমিনুল। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও সঠিক সময়ে তিনি বিশেষ পরীক্ষায় বসতে পারেননি। এমনকি একই ব্যাচের সঙ্গে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় বসার কথা থাকলে সেটি অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। এ বিষয়ে বিভাগের শিক্ষকদের কাছে বারবার ধরনা দিতে হয়েছে তাকে। শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা নেয়া সম্ভব নয় বলে বিভাগ থেকে জানানো হলে আসন্ন মাস্টার্স পরীক্ষার অনিশ্চিয়তা নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে দাবি সহপাঠীদের, যা তাঁর সুইসাইড নোটেও স্পষ্ট বলে জানান মোহাইমিনুলের সহপাঠীরা।
নিখোঁজ হওয়ার আগে মোহাইমিনুল তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসে লেখেন, পরিস্থিতি তাকে কঠোর ও ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। অন্যদের অহংকারের কারণে তিনি সবকিছু হারিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নিজ কক্ষে রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটে তিনি শিক্ষকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আমার হাতে মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো অপশন নেই। কারণ তারা আমাকে এই দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাবা-মা’র অবর্তমানে ক্যাম্পাসে রানিং স্টুডেন্টদের শ্রেষ্ঠ অভিভাবক হলো শিক্ষক। কিন্তু যারা ভালো বাবা-মা হতে পারে নাই, তারা আবার শিক্ষক! ৬ মাস নাটক করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে আমাকে। আমি কোন নাটক/সিনেমা করতাছি না। আমার লাশটা পেলে টুকরা টুকরা করে তাদেরকে ইকুয়ালি ভাগ করে দিও প্রিয় ক্লাসমেটরা।”
আরেকটি চিরকুটে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ছোট ভাইকে তুরস্কে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। বন্ধুদের কাছ থেকে নেওয়া ধারের টাকার হিসাব ও টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশনাও আলাদা চিরকুটে লেখেন তিনি।
সহপাঠীর নিখোঁজ হওয়া এবং চিরকুটে শিক্ষকদের দায়ী করার জেরে ভূতাত্ত্বিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিভাগে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে ৭ দফা দাবি জানিয়েছেন।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১২ ঘণ্টার মধ্যে মোহাইমিনুলকে খুঁজে বের করা, তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত কমিটি গঠন, বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক হোসাইন মোহাম্মদ সায়েম ও ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক আবু সাদাত মোহাম্মদ শামের পদত্যাগ, সংশ্লিষ্ট কোর্সের উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন, কোনো শিক্ষার্থী বা ব্যাচকে হয়রানি কিংবা লক্ষ্যবস্তু করা বন্ধ করা, দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ক্যাম্পাসে অবস্থান নিশ্চিত করা বিভাগে দ্রুত ছাত্র সংসদ কার্যকর করা, এবং শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার (১১ অক্টোবর) বিকাল ৩টা ৮ মিনিটে মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে থেকে ঢাকাগামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিআরটিসি বাসে ওঠেন মোহাইমিনুল। পরে হলের ‘এ’ ব্লকের ১১০ নম্বর কক্ষ থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়। নোটে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি লেখেন, “ছয় মাস নাটক করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে আমাকে।” এরপর থেকে তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
মোহাইমিনুলকে উদ্ধারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে বলে জানিয়েছে। সাভার ও আশুলিয়া থানা এ ক্ষেত্রে যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানানো হয়।
একই সঙ্গে ঢাকা জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করছেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলাম। মোহাইমিনুলের পরীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নোটে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পৃথক এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “গত ১১ অক্টোবর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. মোহাইমিনুল ইসলাম আবাসিক হলে সুইসাইড নোট লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ঢাকায় যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস থেকে ঢাকায় কাটাবন এলাকায় নামার পর তার কোনো খোজ-খবর পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার অনুন্ধান করা হচ্ছে। যদি কেউ তাকে শনাক্ত করতে পারেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (নিরাপত্তা) ০১৭১২৬৭৪৫৫৭ নম্বরে জানাতে অনুরোধ করা যাচ্ছে।”
