সুস্থ থাকতে পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি জরুরি নিয়মিত সময়সূচি
অনলাইন ডেস্ক
সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তবে দীর্ঘায়ু ও সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে শুধু ঘুমের সময় নয়, প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমবিষয়ক গবেষকদের মতে, পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি সময়সূচিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি।
আধুনিক জীবনযাত্রায় নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস ধরে রাখা অনেকের জন্য কঠিন। কাজের চাপ, সামাজিক ব্যস্ততা, সকালে ব্যায়াম কিংবা রাতে বিনোদনের কারণে প্রতিদিন ঘুমানোর সময় বদলে যায়। অনেকে কর্মদিবসে কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে বেশি সময় ঘুমিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেন। তবে এতে শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ পুরোপুরি ফিরে আসে না।
শরীরের জৈবঘড়ির সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক
মানবদেহে একটি অভ্যন্তরীণ সময় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে, যা সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবঘড়ি নামে পরিচিত। এটি ঘুম ও জেগে থাকার স্বাভাবিক চক্র নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। পাশাপাশি হরমোন নিঃসরণ, বিপাকক্রিয়া ও কোষের পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
প্রতিদিন ঘুমানোর ও ঘুম থেকে ওঠার সময় ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। ফলে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও শরীরের অভ্যন্তরীণ সময়সূচি ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে সমন্বয় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রিব্যালেন্স হেলথের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাস্টিন হাইয়ের মতে, শরীর নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনে ভালোভাবে সাড়া দেয়। অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ি শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমকে নির্দিষ্ট ছন্দে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেয়ে শরীরের জন্য নির্ভরযোগ্য ঘুমের রুটিন তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঘুম থেকে ওঠার সময় নিয়মিত রাখার অভ্যাস কার্যকর হতে পারে।
অনিয়মিত ঘুম যেভাবে স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে
ঘুমের সময় প্রতিদিন পরিবর্তিত হলে শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক কার্যক্রমের সঙ্গে দৈনন্দিন রুটিনের অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘সোশ্যাল জেট ল্যাগ’।
জাস্টিন হাইয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শরীর কখন সজাগ থাকবে এবং কখন ঘুমের প্রস্তুতি নেবে, তা নির্ধারণে কর্টিসল ও মেলাটোনিনের মতো হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় কর্টিসলের মাত্রা স্বাভাবিকভাবে বাড়ে, যা শরীরকে জেগে উঠতে সহায়তা করে। অন্যদিকে মেলাটোনিন শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সংকেত দেয়।
ঘুমানোর ও ঘুম থেকে ওঠার সময় নিয়মিত পরিবর্তিত হলে এসব হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণের সময়েও প্রভাব পড়তে পারে। এতে শরীরের ঘুম ও জেগে থাকার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দীর্ঘদিন অনিয়মিত ঘুমের সঙ্গে হৃদ্রোগ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ঘুমকে কেবল শারীরিক বিশ্রাম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘুমের সময় শরীরের বিভিন্ন জৈবিক পুনর্গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজও সম্পন্ন হয়।
শুধু বেশি সময় ঘুমালেই কি ঘাটতি পূরণ হয়?
অনেকের ধারণা, সপ্তাহের কর্মদিবসে কম ঘুমালেও ছুটির দিনে বেশি সময় ঘুমিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। কর্মদিবসে চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়ে সপ্তাহান্তে দীর্ঘ সময় ঘুমালে সাময়িকভাবে ক্লান্তি কমতে পারে। তবে এতে পুরো সপ্তাহের অনিয়মিত ঘুমের প্রভাব দূর হয় না।
ঘুমবিষয়ক গবেষণায় নিয়মিত ঘুমের অভ্যাসকে স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জাস্টিন হাইয়ের উল্লেখ করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত্যুঝুঁকি অনুমানের ক্ষেত্রে ঘুমের মোট সময়ের তুলনায় ঘুমের নিয়মিততা আরও শক্তিশালী নির্দেশক হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কম ঘুমিয়েও শুধু নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চললে সুস্থ থাকা সম্ভব। পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর লক্ষ্য রাখা উচিত। পাশাপাশি সপ্তাহান্তেও ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার সময় যথাসম্ভব কাছাকাছি রাখা প্রয়োজন।
নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়বেন যেভাবে
অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস পরিবর্তনে বড় কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মানানসই কয়েকটি সহজ নিয়ম অনুসরণ করেই ধীরে ধীরে ঘুমের সময়সূচিতে ধারাবাহিকতা আনা সম্ভব।
প্রথমে প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি করুন। এমন একটি সময় বেছে নিন, যা কাজ ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দিনের আলোতে কিছুটা সময় কাটান। এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়িকে স্বাভাবিক ছন্দে রাখতে সহায়তা করে। এ জন্য খুব ভোরে ওঠার প্রয়োজন নেই; নিয়মিত মেনে চলা সম্ভব, এমন সময় বেছে নেওয়াই মূল বিষয়।
ঘুমানোর আগে অন্তত ৩০ মিনিট শান্তভাবে কাটানোর অভ্যাস করুন। সারাদিনের কাজ শেষ করেই বিছানায় গেলে শরীর ও মন দ্রুত বিশ্রামের অবস্থায় যেতে পারে না। এ সময় ঘরের আলো কমিয়ে দেওয়া, মুঠোফোন দূরে রাখা, বই পড়া কিংবা পছন্দের গান শোনার অভ্যাস করতে পারেন। চাইলে হালকা গরম পানিতে গোসলও করতে পারেন। এসব অভ্যাস শরীর ও মনকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।
বিকেলের শেষ ভাগে কফি পান এবং রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মুঠোফোন ব্যবহার ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিকেলের পর ক্যাফেইন গ্রহণ কমানো এবং ঘুমানোর আগে কিছু সময়ের জন্য মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধ রাখার অভ্যাস করা ভালো। পছন্দের বিনোদন পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে কখন এবং কতক্ষণ এসব ব্যবহার করছেন, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
ঘুমের রুটিন নিয়ে অতিরিক্ত চাপ নয়
ঘুমের নিয়মিততা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে নতুন কোনো মানসিক চাপের কারণ বানানো উচিত নয়। কোনো কারণে একদিন দেরিতে ঘুমাতে গেলে পরদিন পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। জাস্টিন হাইয়ের পরামর্শ অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সময়সূচি বজায় রাখার চেয়ে পর্যাপ্ত ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এরপর সুযোগমতো আবার স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসতে হবে।
ঘুমের উন্নতির জন্য ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন সাবস্ক্রিপশন কিংবা জটিল পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুম থেকে ওঠা এবং ঘুমানোর আগে শান্ত পরিবেশ তৈরি করার মতো সাধারণ অভ্যাসই দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর হতে পারে।
সব সময় নিখুঁতভাবে ঘুমের নিয়ম মেনে চলা সম্ভব নয়। তবে অধিকাংশ দিন একটি নির্দিষ্ট রুটিন বজায় রাখতে পারলে শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ির সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সমন্বয় রাখা সহজ হয়। তাই দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের জন্য শুধু রাতে কত ঘণ্টা ঘুমানো হচ্ছে, তা নয়; ঘুমের সময়সূচি কতটা নিয়মিত রাখা যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
