হুতির হামলায় অস্থির সৌদি, একের পর এক ভুলের খেসারত দিচ্ছে রিয়াদ
অনলাইন ডেস্ক
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতি, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিল সৌদি আরব। কিন্তু সেই পরিকল্পনাতেই এখন বড় ধাক্কা দিচ্ছে ইয়েমেনের নতুন সংঘাত। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর এবং তেল অবকাঠামো আক্রান্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে জোটে ফাটল, হুতিদের মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত অবস্থান রিয়াদকে নতুন করে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটির অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন এবং বড় ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইয়েমেন থেকে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই পরিকল্পনার জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।
প্রায় ১১ বছর ধরে ইয়েমেনের সংঘাত সামরিক অভিযান ও কূটনীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। ইরানের মিত্র হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে রিয়াদ তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় যায় এবং তেহরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত অবস্থার পর চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র হয়ে ওঠে। গত মাসে সংঘাতের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ধারাবাহিক কিছু ভুল হিসাব-নিকাশ বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইয়েমেনে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে গত বছরের শেষ দিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে ফাটল দেখা দেয়। পাশাপাশি সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র কতটা পাশে থাকবে, তা নিয়েও রিয়াদের মূল্যায়নে ভুল ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইউএইর সঙ্গে জোটে ফাটল
ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঠানো সামরিক যানবহরে গত বছর সৌদি যুদ্ধবিমানের হামলার পর দুই দেশের প্রায় এক দশকের পুরোনো জোটে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। একসময় ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় সৌদি আরব ও ইউএই ইয়েমেনে একসঙ্গে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু ওই ঘটনার পর আবুধাবি তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়।
এর ফলে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ইউএইর সেনা সরে যাওয়ার পর যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে পারেনি রিয়াদ। আবুধাবির অধীনে দীর্ঘদিন লড়াই করা হাজারো যোদ্ধাও সৌদির নতুন কৌশলের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ইউএইর সেনারা চলে যাওয়ার সময় দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে হয়নি। তাঁর ভাষ্য, ইউএইর বাহিনীর কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল দক্ষ; কিন্তু সৌদি আরব তার কার্যকর বিকল্প গড়ে তুলতে পারেনি।
হুতিদের হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল না রিয়াদ
ইউএইর সেনা প্রত্যাহারের মাত্র আট সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। সৌদি আরবসহ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদেরও ইরানের সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
ইয়েমেনে ইউএই-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘিরে সংকট সামলানোর পরপরই সৌদি আরবকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ বাড়লে তেহরানের ঘনিষ্ঠ হুতিরা সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে।
গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে সৌদির বিমান অবরোধ উপেক্ষা করে হুতিদের একটি প্রতিনিধিদলকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় নিতে একটি বাণিজ্যিক বিমান পাঠায় তেহরান। বিমানটির সানা বিমানবন্দরে অবতরণ ঠেকাতে সেখানে হামলা চালায় সৌদি আরব।
এর প্রতিক্রিয়ায় হুতিরা যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে সৌদি জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ এবং লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে অভিযান শুরু করে তারা। কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ২০২২ সালের পর এটিই ইয়েমেনে সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন হুতিরা সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইনে হামলা চালায়। এতে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম বেড়ে যায়। পাল্টা জবাবে সৌদি বাহিনীও হুতিদের লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, হুতিদের আকস্মিক হামলার জন্য সৌদি আরব প্রস্তুত ছিল না। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গেও যথাযথ সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। তাঁর মতে, কয়েকটি অঞ্চল হারানোর কারণে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে হুতিদের হাতে এখন এমন উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে আঘাত হানতে সক্ষম।
ট্রাম্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার খেসারত
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর দীর্ঘদিন ধরে নির্ভর করে আসাও সৌদি আরবের অন্যতম বড় ভুল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা পাওয়ার পরও নিরাপত্তার বিষয়ে মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় হতাশ হয়েছে রিয়াদ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেন। তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প এতে জড়াতে অস্বীকৃতি জানান। বরং ওয়াশিংটন ওমানে হুতিদের সঙ্গে বৈঠক করে নিজেদের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার চেষ্টা করে।
হুতিরাও স্পষ্ট করে জানায়, তাদের মূল লড়াই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। এর ফলে লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজগুলো বাধাহীনভাবে চলাচলের সুযোগ পায়।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনির মতে, সৌদি সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্বকে ভিত্তি করে নিজেদের সামরিক কৌশল সাজিয়েছে। ফলে এককভাবে যুদ্ধ পরিচালনার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও কাঠামো গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা সহায়তার বিষয়টি এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর।
বিকল্প মিত্র খুঁজছে সৌদি
পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন অন্য দেশগুলোর সহযোগিতাও চাইছে রিয়াদ। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে কায়রোতে বৈঠক করেন। পরে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ইউএইর ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান।
এদিকে ফ্রান্স সৌদি আরবে সামরিক কর্মী ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠাতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাজ্য সৌদি যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজ পাঠানোর কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার জন্য ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদি আরবে কাজ করছেন।
রিয়াদে জরুরি বৈঠকের পর গত সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করতে সম্মত হয়। এ বছরের শুরুতে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির লক্ষ্য তিন দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো।
অন্যদিকে ইউএই-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীও হুতিবিরোধী অভিযানে অংশ নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সামরিক সাফল্য কি আনবে স্থায়ী সমাধান?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাইরের দেশগুলোর সামরিক সহায়তা কিংবা সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সাময়িক সাফল্য দিয়ে ইয়েমেন সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখনো বড় বাধা। এর পাশাপাশি যুদ্ধের কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পরিণতিও এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি সিএনএনকে বলেন, জোটের বিভিন্ন অংশের কমান্ড সেন্টারগুলোকে একীভূত করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিরোধও মেটাতে হবে। তাঁর মতে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুতিদের কাছ থেকে পুনর্দখল করা অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে সামরিক অর্জনগুলো শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ইয়েমেনের সংঘাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বিরোধের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবকে চাপে রাখতে হুতিদের সমর্থন দেওয়ার আগ্রহ ইরানের আরও বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে আলাদা কূটনৈতিক সমাধানের পথে যেতে পারে। অন্যদিকে হুতি নেতৃত্বকে দুর্বল করতে সামরিক অভিযানও আরও জোরদার হতে পারে। তবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনির মতে, নিকট ভবিষ্যতে এই দুই পথের কোনোটিই ইয়েমেন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবে না।
ফলে সৌদি আরবের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—নিজেদের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে ইয়েমেনের নতুন যুদ্ধের মোকাবিলা করবে রিয়াদ। মিত্রদের বিভক্তি, হুতিদের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত ভূমিকার মধ্যে সৌদি আরবকে আপাতত আরও জটিল ও অনিশ্চিত পথেই এগোতে হচ্ছে।
