অ্যামাজনের সতর্কবার্তা: জলবায়ু বিপর্যয়ে যেভাবে জীবন সংকটে ক্রান্তীয় মাছ
অনলাইন ডেস্ক
ছোটবেলায় ব্রাজিলের গ্রামীণ সাও পাওলোর লেকের জলে বাবার সাথে ছিপ ফেলে মাছ ধরা দেখতে দেখতে কৌতূহলী এক বালক কেবলই ভাবত, জলের নিচের প্রাণীগুলো কীভাবে বেঁচে থাকে! উত্তর খুঁজতে গিয়ে একদিন কয়েকটা মাছ জারে পুরে বাসায় নিয়ে এল সে। কিন্তু পরদিনই দেখে সেগুলো সব মরে পড়ে আছে। বালকটি ভীষণ ব্যথিত হলেও তার কৌতূহল কিন্তু থেমে থাকেনি। উল্টো এক প্রবল জেদ চেপে বসে তার মনে, জানতেই হবে কীভাবে মাছেরা বেঁচে থাকে। সেই ছোট্ট বালকটিই আজকের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জলবায়ু ও প্রাণিবিজ্ঞানী অধ্যাপক আদালবের্তো লুইস ভাল।
ব্রাজিলের অ্যামাজন রেইনফরেস্টের বিখ্যাত শহর মানাউসকে গত পাঁচ দশকে ট্রপিক্যাল বা ক্রান্তীয় জলবায়ু বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান গবেষণাকেন্দ্রে পরিণত করেছেন সত্তর বছর বয়সী এই বিজ্ঞানী। একাধারে ইকোফিজিওলজিস্ট ও গবেষক লুইস ভাল তার দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক জীবনে উন্মোচন করেছেন কীভাবে মাছ ফুলকা ও গ্যাসের মাধ্যমে জল থেকে অক্সিজেন শোষণ করে জীবন ধারণ করে এবং জলবায়ুর ভারসাম্য বিগড়ে গেলে কীভাবে সেই জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। এই বিস্তৃত অনুসন্ধানের সূত্র ধরেই তার দৃষ্টি আটকে যায় অ্যামাজনের অত্যন্ত প্রিয় ও সুস্বাদু এক মাছ ‘তাম্বাকি’র ওপর।
কয়লাখনিতে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি আগাম টের পেতে আগেকার দিনে যেভাবে খাঁচাবন্দি ক্যানারি পাখিকে নামানো হতো, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় বিপর্যস্ত অ্যামাজনে যেন ঠিক সেই ক্যানারি পাখির ভূমিকা পালন করছে ‘তাম্বাকি’। এই বিশাল আকৃতির প্রজাতিটি মূলত জলের ওপরের তলের অক্সিজেন গ্রহণকারী মাছ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলের অক্সিজেন লেভেল আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে গেলে এরা জলের উপরিভাগে ভেসে ওঠে। কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাম্বাকি তাদের নিচের ঠোঁটটি বিশেষভাবে গঠন করেছে, যা জলের ঠিক ওপরের স্তরে জমে থাকা সমান্য অক্সিজেনযুক্ত জল শুষে নিতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানী ভালের গবেষণা বলছে, কেবল নিজের বেঁচে থাকা নয়, তাম্বাকির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে বস্তুত খোদ অ্যামাজন বনের টিকে থাকার সক্ষমতা ও তার ভবিষ্যৎ বোঝা সম্ভব।
বিজ্ঞানী ভাল স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিগত সাড়ে ছয় কোটি বছর ধরে অ্যামাজন অববাহিকার জলবায়ু ছিল অত্যন্ত স্থিতিশীল ও পূর্বাভাসযোগ্য। সেখানে শীতল রাতে জলের অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ত এবং উত্তপ্ত দিনে তা কিছুটা কমত। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর থেকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। ব্রাজিলের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অ্যামাজোনিয়ান স্টাডিজের (ইনপা) এই শীর্ষ গবেষক প্রমাণ করেছেন যে, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের মাছের তুলনায় ক্রান্তীয় অঞ্চলের মাছেরা জল ও বায়ুর তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং রাসায়নিক পরিবর্তনের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল।
এমনিতেই অ্যামাজনের ওপর মানুষের ক্ষতিকর হস্তক্ষেপের অন্ত নেই, জঙ্গল কেটে চাষবাস, অবৈধ খনি খনন এবং নদীগুলোতে রাসায়নিক বর্জ্যের মারাত্মক দূষণ নদীর জলজ জীবনকে আগেই ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়। বহু বছর ধরে অ্যামাজন অঞ্চলে জমা হতে থাকা জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণগুলো নথিভুক্ত করার পর, আদলবের্তো ভালের এই যুগান্তকারী গবেষণা অবশেষে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জলজ বিজ্ঞানে জীবনব্যাপী অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাজ্যের সাউথহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিশারিজ সোসাইটি অব দ্য ব্রিটিশ আইলসের সম্মানজনক ‘লে ক্রেন মেডেল’ লাভ করেছেন তিনি। এর আগে ব্রাজিলের গ্র্যান্ড ক্রস অব দ্য ন্যাশনাল অর্ডার অব সাইন্টিফিক মেরিট এবং আমেরিকান ফিশারিজ সোসাইটি অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স লাভ করলেও এই পদকটি ছিল আলাদা। কারণ, আন্তর্জাতিক স্তরে এই প্রথম ট্রপিক্যাল বা ক্রান্তীয় অঞ্চলের কোনো বিজ্ঞানীকে এই সম্মান প্রদান করা হলো। বিশ্বজুড়ে যেখানে জীববৈচিত্র্য সবচেয়ে সমৃদ্ধ অথচ জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই সবচেয়ে কঠিন, সেই অনাবিষ্কৃত প্রান্তীয় বিজ্ঞানকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক অনন্য মাইলফলক এটি।
বিজ্ঞানী ভালের দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার জীববিজ্ঞানী ক্রিস উড মন্তব্য করেন যে, উত্তর আমেরিকা বা উত্তর ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর অনেক চমৎকার গবেষণা হলেও বিষুবরেখার একদম কাছাকাছি এমন বিস্তৃত গবেষণা আগে কেউ করেনি, অথচ এখানেই মানুষের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, বন উজাড় এবং ক্রান্তীয় অঞ্চলে মানুষের অভিবাসনের ফলে সেখানে একটি বিষম দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
জলবায়ুর এই নাটকীয় রূপান্তর সবাই অনুভব করতে পারলেও বৈজ্ঞানিক তথ্যের মাধ্যমে তা পরিমাপ করা সহজ ছিল না। সেই কঠিন কাজটিই হাতে নেন লুইস ভাল। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যামাজনের মাছেরা ২৭ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সংকীর্ণ তাপমাত্রার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকে। এর থেকে সামান্য বেশি উত্তাপও তাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।
এই বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য ইনপা-তে ভাল এবং তার গবেষক দল ল্যাবরেটরিকে চারটি ভিন্ন কক্ষে বিভক্ত করে তাম্বাকি ও অন্যান্য জলজ প্রজাতির শারীরিক প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। তিনটি কক্ষে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের (আইপিসিসি) পূর্বাভাস অনুযায়ী ২১০০ সালের সম্ভাব্য মৃদু, মাঝারি ও চরম জলবায়ু প্রভাবের কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করা হয়। আর চতুর্থ কক্ষটি ছিল নিয়ন্ত্রিত, যেখানে বনের মধ্যকার টাওয়ারে বসানো সেন্সর থেকে সংগৃহীত রিয়েল-টাইম ডাটার ওপর ভিত্তি করে বর্তমান তাপমাত্রা, কার্বন ডাই অক্সাইড, আলো ও আর্দ্রতা বজায় রাখা হয়েছিল।
গবেষণায় তারা দেখেন, অতিরিক্ত উত্তাপ জলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং অক্সিজেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দেয়। ফলে মাছেদের রক্তসংবহনতন্ত্র, মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া এবং স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্ষমতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরও ভীতিজনক বিষয় হলো, এই মাছগুলোর সংকট কেবল জলাশয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। ড. ভাল স্পষ্ট করে বলেন, তাম্বাকি মাছ নদীর জলপথ ধরে উদ্ভিদের বীজ ছড়িয়ে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ফলে এই মাছেদের সংখ্যা কমে যাওয়া মানে অ্যামাজনের বনের নিজস্ব স্বাভাবিক পুনর্গঠন ক্ষমতা চিরতরে ব্যাহত হওয়া।
ল্যাবরেটরির বাইরে গিয়েও গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন কীভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুষ্ক মৌসুমকে আরও দীর্ঘায়িত ও ভয়াবহ করে তুলছে। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের পরপর দুটি রেকর্ড খরা গোটা অ্যামাজন অববাহিকায় বিপুল সংখ্যক মাছ ও নদীর ডলফিনের গণমৃত্যু ঘটিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক যে, ব্রাজিলের জীববৈচিত্র্য বিষয়ক সংস্থা ‘আইসিএমবিআইও’ সম্প্রতি তাম্বাকিকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে।
ভালের গবেষণা আরও সতর্ক করে যে, মানুষের বিভিন্ন আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে ক্রান্তীয় জলপথগুলো চরম বিপদের মুখোমুখি। বন পোড়ানোর ধোঁয়া ও ছাই বায়ুমণ্ডল এবং জলাশয়ে মিশছে, অন্যদিকে খনি ও কৃষি খামার থেকে আসা বিষাক্ত কেমিক্যাল ও বর্জ্য নদীর জল এবং ভূগর্ভস্থ অ্যাকুইফারকে দূষিত করছে। এর ফলে পানীয় জল দূষিত হচ্ছে এবং তাম্বাকি মাছের শরীরে জমা হওয়া তামা, পারদ, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও কীটনাশকের মারাত্মক প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানবদেহেও প্রবেশ করছে। তাছাড়া, উষ্ণ ও আদ্র পরিবেশ নদীর ইকোসিস্টেমে বিষাক্ত অ্যালগির প্রভাব বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং মশার বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই পরিবেশগত বিপর্যয় সরাসরি প্রভাব ফেলছে অ্যামাজন অববাহিকার আটটি দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় চার কোটি মানুষের ওপর, যাদের খাদ্যাভ্যাসে তাজা জলের মাছ প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ভূমিকা রাখে। বিশ্বব্যাপী মানুষের প্রোটিন চাহিদার ৬.৭ শতাংশ মাছ থেকে এলেও, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ গোলার্ধের প্রায় ৩.১০ বিলিয়ন মানুষ তাদের দৈনিক প্রোটিনের অন্তত পাঁচ ভাগের এক ভাগের জন্য মাছের ওপর নির্ভরশীল। উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের ক্ষেত্রে তাদের খাদ্যতালিকায় মাছের অবদান ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।
আদালবের্তো ভালের এই সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অ্যামাজনে যা ঘটে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বে পড়ে। ট্রপিক্যাল বায়োম এবং জীবনদায়ী জলপথগুলোতে কাটছাঁট না করে মৌলিক গবেষণা জোরদার করা ছাড়া এই ভয়াবহ সংকট প্রতিহত করা অসম্ভব। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অ্যামাজনের মতো বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সায়েন্স ও প্রযুক্তিতে ব্রাজিলের মোট বিনিয়োগের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়। এই বৈজ্ঞানিক অবহেলার ফলস্বরূপ আমরা এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
সতর্কবার্তা দিয়ে ডক্টর লুইস ভাল শেষ বয়সেও আকুল আবেদন জানিয়েছেন, অ্যামাজনের প্রতিটি প্রজাতি এই পরিবেশ ও বনের টিকে থাকা সম্পর্কে অগণিত মূল্যবান তথ্য ধারণ করে আছে। আমরা যখন এদের কোনো একটিকে ধ্বংস করি, তখন প্রকৃতপক্ষে আমরা এক অজানা সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করে ফেলি, হয়তো এমন কোনো অমূল্য জ্ঞান হারিয়ে যায় যা আমরা কখনো জানতে পারিনি, আর হয়তো কোনোদিন জানতে পারবও না।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
