আমেরিকার ইরাক প্রকল্প ব্যর্থ, এরপর কি হবে?

অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি ও ইরাক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতির সমাপ্তি ঘটছে বড় ধরনের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে। ওয়াশিংটন যখন প্রথম ইরাকে তাদের এই বিশাল রাজনৈতিক ও সামরিক প্রকল্প শুরু করেছিল, তখন যে ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা ছিল, বহুল কাঙ্ক্ষিত এই সেনা প্রত্যাহারের পরও ইরাক ঠিক একই স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের চূড়ান্তভাবে বিদায় নেওয়ার প্রক্রিয়াটি যেমন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রাজনৈতিক মাইলফলক, তেমনি এতেই মিটে যাচ্ছে না দেশটির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ ক্ষত। মার্কিন হস্তক্ষেত্রের ফলে সৃষ্ট ক্ষমতার বিভাজন, গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অনাস্থা এবং একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও বহুবছর ছায়া ফেলে রাখবে।

২০০৩ সালের মার্চ মাসে ইরাক আক্রমণের মধ্য দিয়ে আমেরিকা সেদেশের শাসনব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। ওই সময় সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অযুহাতে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো অস্ত্রের সন্ধান মেলেনি। খুব দ্রুত সাদ্দাম সরকারের পতন ঘটলেও একটি নতুন ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আমেরিকার সামরিক সক্ষমতার পক্ষে সম্ভব হয়নি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ইরাকি সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করা এবং সাদ্দামের বাথ পার্টির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঢালাওভাবে অপসারণ করার সিদ্ধান্তটি দেশটির প্রশাসনিক ও সামাজিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে ভেঙে দেয়। হাজার হাজার সামরিক ও বেসামরিক পেশাজীবী এক রাতে কর্মহীন ও কোণঠাসা হয়ে পড়ায়, যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় তা সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয় এবং পর্যায়ক্রমে তা সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে উস্কে দেয়। এই সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্টি হওয়া শূন্যতা পরবর্তীতে রাষ্ট্রকে আরও বেশি সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে সার্বিক পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে, তবে এর সব দায় কেবল মার্কিন সিদ্ধান্তের ওপর চাপানো যুক্তিসঙ্গত হবে না। ইরাকের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ দলীয় বা গোষ্ঠীগত ভিত্তিতে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিলেন, যা সমাজের একটি বড় অংশকে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আবার প্রতিবেশী দেশগুলোও বাগদাদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজস্ব স্বার্থ হাসিল করেছে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার আগেই ওয়াশিংটন পুরোনো কাঠামো ভেঙে ফেলায় ইরাকজুড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে আমেরিকা তাদের প্রথম দফায় সৈন্য প্রত্যাহার সম্পন্ন করলেও ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের মুখে বাগদাদের অনুরোধেই তাদের আবার ফিরে আসতে হয়েছিল। ওই সময়ে আইএসের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলা, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ সাহায্য অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে স্থলভাগের মূল লড়াইটি লড়াইটি চালিয়েছে ইরাকি সেনাবাহিনী, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পেশমার্গা এবং পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা হাসদ আল-শাবি।

২০১৭ সালে আইএসের আঞ্চলিক কর্তৃত্ব ধ্বংস হওয়া ছিল একটি বিশাল সামরিক অর্জন কিন্তু যে সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে এই চরমপন্থী গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল, তার স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। আমেরিকা যে নিরাপদ ও স্থিতিশীল ইরাক গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রবেশ করেছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের তৈরি করা হুমকি তারা নিজেরাই দমন করে বিদায় নিচ্ছে। এর আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াও ছিল অত্যন্ত জটিল। যে ইরানকে ঠেকানোর উদ্দেশ্যে আমেরিকা পদক্ষেপ নিয়েছিল, সাদ্দাম সরকারের পতন শেষ পর্যন্ত সে দেশটিকে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজস্ব প্রভাব প্রসারের বিশাল সুযোগ এনে দেয়। বিশাল অঙ্কের অর্থ ও সম্পদ ব্যয় করার পরও দিনশেষে ওয়াশিংটনের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের অবস্থানই বাগদাদে সবচেয়ে শক্ত হয়েছে।

বর্তমানে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাকে ইরাকি সমাজের এক বিশাল অংশ দীর্ঘিকালের দখলদারিত্বের অবসান হিসেবে দেখছে। যদিও ২০১৪ পরবর্তী মার্কিন উপস্থিতি আইনিভাবে ইরাক সরকারের সরাসরি আমন্ত্রণে ছিল, তবু বাগদাদের মূল চ্যালেঞ্জ এখন নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং যুদ্ধ ও শান্তির মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো রাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিশেষ করে ২০১৪ সালে গঠিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের মতো বিশাল সশস্ত্র গোষ্ঠীকে পুরোপুরি সরকারের অধীনে আনা এক জটিল রাজনৈতিক জটে পরিণত হয়েছে। কারণ, এই গোষ্ঠীর অন্তর্গত অনেক বাহিনী নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে নিয়েছে, ফলে সরকারের অর্থায়ন গ্রহণ করলেও তারা রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা আদেশ মেনে চলতে নারাজ।

প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইরাকি সরকার সব ধরনের অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে কতাইব হিজবুল্লাহর মতো শক্তিশালী ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই নির্দেশের সরাসরি বিরোধিতা করছে। তাদের যোদ্ধাদের গ্রেফতার বা নিরস্ত্রীকরণের উদ্যোগে ইতোমধ্যে উল্টো প্রতিশোধের হুমকি এসেছে। আমেরিকা, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মাঝে এই গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষা এবং তেহরানের স্বার্থরক্ষায় এই অস্ত্রকে একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে দেখে। ফলে বাগদাদ প্রশাসন এখন ওয়াশিংটনের চাপ এবং তেহরানের কূটনৈতিক প্রত্যাশার মাঝে এক চরম সংকটে পড়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে একযোগে নিরস্ত্রীকরণ করতে গেলে সরকারবিরোধী ঐক্য তৈরি হতে পারে, আবার তাদের নমনীয়তা দেখালে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল একটি ফাঁকা স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে।

মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর অনেকে ২০১৪ সালের মতো নতুন কোনো শক্তিশূন্যতা ও আইএস এর পুনরুত্থানের আশঙ্কা করছেন। কিন্তু বর্তমানে ইরাকি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব আগের চেয়ে অনেক উন্নত। ২০২৫ সালে সশস্ত্র বাহিনীর অব্যাহত অভিযানের কারণে আইএসের হামলা ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। তা সত্ত্বেও, এই জিহাদি সংগঠনটির গোপন নেটওয়ার্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি এবং তারা প্রতিবেশী সিরিয়ার অস্থিতিশীলতার সুযোগ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ইরাকি সরকারের সাথে যদি নিজ দেশের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বড় কোনো সংঘাত তৈরি হয় এবং সেনাবাহিনীর মনোযোগ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ সামলাতে চলে যায়, তবেই কেবল আইএস এর মতো দলগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে বাগদাদ, কুর্দি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে, সেই এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।

অন্যদিকে, আমেরিকা ইরাক থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি কেবল সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার ফল নয়। ওয়াশিংটন মূলত তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়ন করছে। আমেরিকা বর্তমানে ল্যাটিন আমেরিকা, উত্তর আটলান্টিক ও গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে এরবিলে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলা বা ইতালীয় বাহিনীর ওপর আক্রমণের মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলটিতে বিশাল প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং মার্কিন সেনাসদস্যদের স্থায়ী উপস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য একটি অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছিল। একটি তুলনামূলক সস্তা ড্রোন দিয়ে মূল্যবান সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা সম্ভব হওয়ায় আমেরিকার জন্য এই ধরনের মোতায়েন আর লাভজনক বা কার্যকর থাকছে না।

আমেরিকান সৈন্যদের সামরিক ইউনিটগুলো বিদায় নিলেও এই অভিযানের রাজনৈতিক দায় থেকে ওয়াশিংটন মুক্ত হতে পারছে না। তারা ইরাককে এমন এক সংকটাপন্ন মুহূর্তে রেখে যাচ্ছে যখন রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা নেই এবং স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতাও অধরা রয়ে গেছে। আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে পুরোপুরি চলে না গেলেও নিজেদের বিশাল সামরিক উপস্থিতির বিনিময়ে যেখানে রাজনৈতিক সুফল আসছে না, সেখান থেকে কৌশলগতভাবে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। এখন বাগদাদ কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে একটি কার্যকরী সরকার তৈরি করতে পারবে, নাকি মার্কিন বিদায়ের পর তৈরি হওয়া শূন্যতা মেটাতে গিয়ে ইরাক আবার গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়বে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশটির ভবিষ্যৎ।

সূত্র: আরটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights