ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে জোর

শাহেদ আলী ইরশাদ

জরুরি পরিস্থিতিতে ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাঁচামাল উৎপাদনে জোর দিচ্ছে সরকার। আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশে প্রয়োজনীয় অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) তৈরির উদ্যোগের পাশাপাশি প্রধান ওষুধগুলোর ন্যূনতম বাফার স্টক রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০ থেকে ৩০টি জরুরি এপিআই স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে গত মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জরুরি ওষুধের মজুত ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি জাতীয় জরুরি ওষুধ সরবরাহ আকস্মিকতা পরিকল্পনা তৈরি করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরবর্তী বৈঠকে এর খসড়া উপস্থাপন করা হবে।

ওষুধে ৯৮ শতাংশ সক্ষমতা, কাঁচামালে ঘাটতি : দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারকরা দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ করলেও উৎপাদনের মূল উপকরণে রয়েছে বড় ধরনের নির্ভরতা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের তথ্য অনুযায়ী, এপিআই ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ৯০ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, যুদ্ধ বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মতো ঘটনায় এই নির্ভরতা দেশের ওষুধ সরবরাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটও তখন পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বৈঠকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল মুক্তাদির বলেন, দেশের ওষুধশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী হলেও কাঁচামালের ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা রয়েছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় সরকারি সহযোগিতা ও নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি ২০ থেকে ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ এপিআই স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য অগ্রাধিকার তালিকা করার প্রস্তাব দেন তিনি।

কাঁচামাল আমদানিতে বছরে বিলিয়ন ডলার : বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়েট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রয়োজনীয় এপিআই-এর প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করা হয়। এ কারণে প্রতিবছর ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।

সংগঠনটি বলছে, দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে পারলে আমদানি ব্যয় কমার পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট ও কাঁচামালের মূল্য ওঠানামার প্রভাব মোকাবিলা সহজ হবে। চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সংগঠনটি জানিয়েছে, শক্তিশালী এপিআই শিল্প ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। এতে দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থানও বাড়বে।

দ্রুত চালু হবে গজারিয়া এপিআই পার্ক : দেশে এপিআই উৎপাদনের অবকাঠামো তৈরিতে গজারিয়া এপিআই শিল্প পার্ক দ্রুত চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পার্কটি কার্যকরভাবে চালু করা গেলে এ খাতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণে কর সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, পরিবেশগত অনুমোদন সহজীকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এপিআই ব্যবহারে ওষুধ কোম্পানিগুলোকে উৎসাহ দেওয়ার নীতিও প্রয়োজন।

রপ্তানি বাড়লেও কাঁচামালেই বড় নির্ভরতা : দেশের ওষুধশিল্পের সক্ষমতা রপ্তানিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি ছিল ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ২৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দেড় দশকে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন ও রপ্তানিতে সক্ষমতা বাড়লেও কাঁচামালের জন্য প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় দেশের ওষুধশিল্পের একটি বড় দুর্বলতা। জরুরি এপিআইয়ের স্থানীয় উৎপাদন শুরু করা গেলে এই চাপ কমানোর পাশাপাশি সংকটকালে ওষুধের সরবরাহও সুরক্ষিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights