খুশিতেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার!
অনলাইন ডেস্ক
মেয়ের বিয়েতে আনন্দের কোনো খামতি ছিল না। আলোঝলমলে চারপাশ আর স্বজনদের কোলহলোল; সব মিলিয়ে এক মায়ের জীবন যেন পূর্ণতায় ভরে উঠেছিল। কিন্তু এই সীমাহীন আনন্দই যে এক মূহূর্তে হৃদরোগের ছদ্মবেশে নেমে আসবে, তা কে জানত! ঠিক এমনই এক বিরল ঘটনা ঘটেছে কাতারে। মেয়ের বিয়ের চরম আনন্দের পর হৃদরোগের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৬৫ বছর বয়সী এক নারী। প্রাথমিকভাবে একে স্বাভাবিক হার্ট অ্যাটাক মনে হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা তাজ্জব বনে যান। তারা জানান, কোনো ধমনী ব্লক হয়ে নয় বরং উপচে পড়া খুশির চোটে সাময়িকভাবে বিকল হয়ে পড়েছিল তার হৃদযন্ত্র। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিরল চিকিৎসাগত অবস্থাকে বলা হয় ‘হ্যাপি হার্ট সিন্ড্রোম’।
জানা যায়, ওই নারী বেশ কিছুদিন ধরেই বুকের সমস্যায় ভুগছিলেন, যদিও আগের পরীক্ষাগুলোতে কোনো মারাত্মক ত্রুটি মেলেনি। তবে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই তার তিন দিন ধরে তীব্র বুক ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, যা চলাফেরার সাথে আরও বাড়তে থাকে। এরপর তাকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে চিকিৎসকরা তার ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি)তে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ায় কালবিলম্ব না করে তাকে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে রক্তের পরীক্ষায় ‘ট্রোপোনিন’ নামক প্রোটিনের উচ্চ মাত্রা ধরা পড়ে, যা সাধারণত হৃদযন্ত্রের মাংসপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তে নিঃসৃত হয়।
পরবর্তীতে আল্ট্রাসাউন্ড এবং এনজিওগ্রাম করে চিকিৎসকরা দেখতে পান, তার হৃদপিণ্ডের রক্ত সরবরাহের ধমনীগুলোতে কোনো ধরনের ব্লকেজ বা বাধা নেই। তবে তার হৃদযন্ত্রের মূল পাম্পিং প্রকোষ্ঠ (ভেন্ট্রিকলটি) অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গিয়ে এক বিশেষ আকৃতি ধারণ করেছে। এর পাম্প করার ক্ষমতা একধাক্কায় ৫৮ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। পরবর্তী সময়ে এমআরআই করে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন, এর পেছনে স্থায়ী কোনো ক্ষতির দাগ বা টিস্যুর মৃত্যু ঘটেনি। এই ফলাফলের ভিত্তিতে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চিকিৎসকরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, তিনি ‘তাকোতসুবো কার্ডিওমাইওপ্যাথি’ বা সাধারণ ভাষায় ‘ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোমে’ আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে কারণ দুঃখ নয় বরং পরম আনন্দ হওয়ায় একে ‘হ্যাপি হার্ট সিন্ড্রোম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা তীব্র যেকোনো আবেগের মুহূর্তে শরীরে অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ ঘটে। এই হরমোনের হঠাৎ প্রভাবে হৃদযন্ত্র সাময়িকভাবে স্তব্ধ বা অসাড় হয়ে পড়ে। সাধারণত প্রিয়জনের বিয়োগ, হঠাৎ ভয় পাওয়া বা চরম দুঃসংবাদের মতো নেতিবাচক ঘটনার পর এই সিন্ড্রোম দেখা যায়। কিন্তু ২০১৬ সালে গবেষকরা আবিষ্কার করেন যে, অনাবিল আনন্দও এই একই ধরনের শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ ধরনের তীব্র হৃদরোগ সংক্রান্ত জটিলতার মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে তাকোতসুবো কার্ডিওমাইওপ্যাথি দায়ী, আর আনন্দের কারণে এই সমস্যা তৈরি হওয়ার ঘটনা এর মধ্যেও অত্যন্ত বিরল, যা মাত্র ৪ শতাংশের কাছাকাছি।
হাসপাতালে উপযুক্ত প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং হৃদযন্ত্র সচল রাখার থেরাপি দেওয়ার পর ওই নারীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যান। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা করে দেখা যায়, তার হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা আবার স্বাভাবিক মাত্রা অর্থাৎ ৫৬ শতাংশে ফিরে এসেছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দুঃখজনিত কারণে হৃদযন্ত্র সাময়িক বিকল হওয়ার তুলনায় আনন্দজনিত কারণে আক্রান্ত হওয়া রোগীদের সেরে ওঠার সম্ভাবনা ও জটিলতা কম থাকে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স
