‘চা শ্রমিক ও নৃ-গোষ্ঠী নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় বাধা সামাজিক কুসংস্কার’

শাবিপ্রবি প্রতিনিধি

চা শ্রমিক, খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠীর নারী ও কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত নানা অদ্ভুত কুসংস্কার ও চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) এক গবেষণায়। হিট প্রজেক্টের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরিচালিত এই গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল আজ শনিবার (৯ মে) সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের সমাজকর্ম বিভাগের ৪০২ নম্বর কক্ষে এক সেমিনারে উপস্থাপন করা হয়। সেমিনারে চা শ্রমিক ও নৃ-গোষ্ঠী নারী-পুরুষরা উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে, আধুনিক সমাজব্যবস্থায়ও এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মহিলারা প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষায় বিজ্ঞানের চেয়ে লোকজ কুসংস্কারের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই জনগোষ্ঠীর নারীদের মাঝে মাসিক বা পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে এক ধরনের অলৌকিক ভীতি কাজ করে। অনেক নারী মনে করেন, পিরিয়ডের সময় ব্যবহৃত প্যাড বা কাপড় বাইরে ফেললে ‘ভূতের উৎপাত’ বাড়বে। এমন অদ্ভুত ধারণা থেকে তারা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করতে চান না। যারা কাপড় ব্যবহার করেন, তারাও লোকলজ্জা ও এই অলৌকিক ভয়ে কাপড়গুলো বাইরে রোদে না শুকিয়ে ঘরের ভেতর অন্ধকার ও স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় শুকিয়ে পুনরায় ব্যবহার করেন। মাসিকের সময় নানাবিধ শারীরিক জটিলতাকে তারা অতি সাধারণ সমস্যা মনে করেন, ফলে বড় ধরনের অসুস্থতাতেও তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, পরিবার পরিকল্পনা ও সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে নারীদের নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে না। অল্প বয়সে বিয়ের পর দ্রুত সন্তান নেওয়ার জন্য স্বামী ও শাশুড়ির পক্ষ থেকে প্রবল চাপ থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণেও বাধা দেওয়া হয়। এছাড়া হাসপাতাল ও অস্ত্রোপচার (সিজার) নিয়ে এই জনগোষ্ঠীর মাঝে গভীর ভীতি কাজ করে। তারা মনে করেন, হাসপাতালে গেলেই চিকিৎসকরা অপ্রয়োজনে সিজার করবেন। এই আতঙ্ক থেকে তারা বাড়িতেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সন্তান প্রসব করেন এবং প্রসব-পরবর্তী সময়েও কোনো চিকিৎসকের কাছে যান না।

গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন অনুষ্ঠানে গবেষকরা জানান, সিলেটে বসবাসরত খাসিয়া, গারো ও চা শ্রমিকদের মাঝে প্রচলিত এই সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারগুলোই তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রধান অন্তরায়। বিশেষ করে কুসংস্কার বা অলৌকিক বিশ্বাসের কারণে নারীরা যেভাবে নিজেদের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছেন, তা নিরসনে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মাঝে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে না পারলে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয় বলে অনুষ্ঠানে মত প্রকাশ করা হয়।

হিট প্রজেক্টের অধীনে ‘সিলেটের খাসিয়া, গারো এবং চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের নারী ও কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নয়ন’ প্রকল্পে তত্বাবধায়ক হিসেবে রয়েছেন সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসমাঈল হোসেন, অধ্যাপক ড. ফয়সাল আহমেদ ও লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী। এ ছাড়াও গবেষণা সহকারী দলে ছিলেন সমাজকর্ম বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মার্জিয়া সুলতানা পিংকি, আতিয়া শারমিন, রুবেল মিয়া, মরিয়ম আঞ্জুম জেরিন ও লোকপ্রশাসন বিভাগের ময়ূরী দেবনাথ এবং ঝুমা খানম স্মৃতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights