তেহরান সংকটে ফিরে দেখা ভিয়েতনাম: কেন হোঁচট খেয়েছিল সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র
অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ সকাল। মধ্যপ্রাচ্যে আবারও অস্থিরতা। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের খবরে বিশ্ব রাজনীতি নতুন করে দুলে ওঠে। ওয়াশিংটনের হিসাব ছিল পরিচিত—দ্রুত চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে নতি স্বীকারে বাধ্য করা। কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়, যুদ্ধ সব সময় পরিকল্পনামাফিক চলে না। শক্তি আছে, অস্ত্র আছে—তবু নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে সময় লাগে না।
বিশ্ব যখন আজকের যুদ্ধ ও সংঘাত নিয়ে উত্তপ্ত—মধ্যপ্রাচ্য হোক বা অন্য কোথাও—তখন পঞ্চাশ বছর আগের একটি যুদ্ধ আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সেই যুদ্ধের নাম ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এটি কেবল একটি সামরিক পরাজয়ের গল্প নয়; এটি শক্তি, অহংকার ও বাস্তবতা না বোঝার খেসারতের ইতিহাস।
শুরুটা ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা
১৯৫০–এর দশকের শেষ দিক। শীতল যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চোখে ভিয়েতনাম ছিল একটি ‘ডমিনো’। আশঙ্কা ছিল—একটি দেশ কমিউনিজমের হাতে গেলে গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একে একে কমিউনিস্ট প্রভাবের আওতায় চলে যাবে। এই ‘ডমিনো থিওরি’ থেকেই ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু। ১৯৫৫ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে এই যুদ্ধ শুরু হয়। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে জড়ালেও, ১৯৬৫ সালে তারা সরাসরি পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধে নামিয়ে পড়ে। সে সময় মার্কিন সামরিক শক্তি ছিল প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আধুনিক অস্ত্র, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, প্রশিক্ষিত সেনা—সবই ছিল তাদের হাতে। ওয়াশিংটনে অনেকেই বিশ্বাস করতেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আকাশপথে বোমাবর্ষণ করলেই শত্রু ভেঙে পড়বে। কিন্তু ভিয়েতনামের মাটি অন্য গল্প লিখতে শুরু করে।
যুদ্ধটা ছিল অচেনা—শত্রুও অচেনা
ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের যুদ্ধের মুখোমুখি হয়, তা ছিল তাদের অভ্যস্ত যুদ্ধের ধরন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে নির্দিষ্ট কোনো ফ্রন্টলাইন ছিল না। শত্রু কখনো সামনে, কখনো পেছনে, আবার অনেক সময় চোখের সামনেই—কিন্তু চেনার উপায় নেই। ভিয়েত কং মূলত দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেই মানুষজন, যারা উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সমর্থন করত। দিনে তারা কৃষক, শ্রমিক, দোকানি—আর রাত নামলেই যোদ্ধা। এই দ্বৈত পরিচয় মার্কিন সেনাদের মানসিকভাবে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত করে। যুদ্ধক্ষেত্রে ভয় শুধু বুলেটের নয়—ভয় অনিশ্চয়তার।
প্রকৃতিই যখন সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ
ভিয়েতনামের জঙ্গল কোনো সাধারণ বন ছিল না। এটি ছিল ঘন, আর্দ্র, জীবনভরা—আর শত্রুভরা। এই জঙ্গলই ছিল ভিয়েত কংদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। তারা গাছপালা, লতা ও ঘন ঝোপে লুকিয়ে থেকে অতর্কিতে হামলা চালাত। এই জঙ্গল ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে একের পর এক কঠোর কৌশল। ১৯৬১ সালে শুরু হয় অপারেশন ট্রেইল ডাস্ট। এতে ব্যবহার করা হয় ভয়ংকর রাসায়নিক—Agent Orange। এর উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গলের লতাপাতা ঝরিয়ে দেওয়া, যাতে ভিয়েত কংদের লুকিয়ে থাকার জায়গা না থাকে এবং Ho Chi Minh Trail নামের গোপন সরবরাহপথ সহজে দেখা যায়। কিন্তু এর ফল হয় ভয়াবহ। জঙ্গল পরিষ্কার হলেও অসংখ্য নিরীহ মানুষের ফসলি জমি নষ্ট হয়, পশুপাখি মারা যায়, আর পরবর্তী প্রজন্ম বহন করে জন্মগত বিকলাঙ্গতার বোঝা।

ভিয়েতনামের জঙ্গল কোনো সাধারণ বন ছিল না। এটি ছিল ঘন, আর্দ্র, জীবনভরা—আর শত্রুভরা
ভিয়েতনামের জঙ্গল কোনো সাধারণ বন ছিল না। এটি ছিল ঘন, আর্দ্র, জীবনভরা—আর শত্রুভরা।
নাপাম: আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার রাজনীতি
জঙ্গল পরিষ্কারের আরেক অস্ত্র ছিল নাপাম বোমা। জেলির মতো পেট্রোল, যা আগুন ধরলে সহজে নিভত না। এটি আন্ডারগ্রোথ ধ্বংস করলেও মানুষের গায়ে লেগে ভয়াবহ দগ্ধ ক্ষত সৃষ্টি করত। গ্রাম, ঘরবাড়ি, মানুষ—সবকিছুই এই আগুনে পুড়ে যেত। এই নিষ্ঠুরতার কোনো সামরিক সাফল্য আসেনি। বরং সাধারণ ভিয়েতনামিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
নাপাম বোমার হামলা থেকে বাঁচতে আরও কয়েকটি শিশু-কিশোরের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে ৯ বছর বয়সী ফ্যান থি কিম ফুক
নাপাম বোমার হামলা থেকে বাঁচতে কয়েকটি শিশু-কিশোর দৌড়াচ্ছে
বন্দিদশার গ্রাম: স্ট্র্যাটেজিক হ্যামলেট
১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকার নেয় আরেক পরিকল্পনা—Strategic Hamlets। উদ্দেশ্য ছিল গ্রাম থেকে ভিয়েত কংদের আলাদা করা। বাস্তবে, গ্রামবাসীদের জোর করে সরিয়ে কাঁটাতারে ঘেরা নতুন বসতিতে নেওয়া হয়। এসব এলাকা ছিল মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। তাদের পূর্বপুরুষের কবরস্থান, চাষের জমি—সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় তাদের। ফলাফল: নিরাপত্তা নয়, জন্ম নেয় ক্ষোভ।
আকাশ থেকে বৃষ্টি, কিন্তু লক্ষ্যহীন
১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮—অপারেশন রোলিং থান্ডার। উত্তর ভিয়েতনামে লাগাতার বোমাবর্ষণ। উদ্দেশ্য ছিল সৈন্য ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা। কিন্তু উত্তর ভিয়েতনামে বড় কোনো শিল্পকেন্দ্র না থাকায় এই বোমাবর্ষণের কার্যকারিতা ছিল সীমিত। অনেক সময় বোমা পড়ে স্কুল, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ বাড়তে থাকে।
‘সার্চ অ্যান্ড ডেস্ট্রয়’: সন্দেহের রাজনীতি
মাঠপর্যায়ে চালানো হয় অনুসন্ধান ও ধ্বংস (Search and Destroy) অভিযান। হেলিকপ্টারে গ্রামে নেমে সন্দেহভাজনদের হত্যা। কিন্তু সমস্যাটা ছিল—ভিয়েত কং চেনার কোনো নির্ভরযোগ্য উপায় ছিল না। ফলে নিহতদের বড় অংশই ছিল নিরীহ মানুষ। ১৯৬৮ সালে মাই লাই গ্রামে ঘটে ভয়াবহ গণহত্যা। নারী ও শিশুসহ শতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। ভিয়েতনামি জনগণ প্রশ্ন করতে শুরু করে—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই তাদের পক্ষে?
জনগণ ছাড়া যুদ্ধ জেতা যায় না
এই যুদ্ধেই স্পষ্ট হয়ে যায়—যোদ্ধারা একা নয়। গ্রামবাসীরাই ছিল ভিয়েত কংদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা দিয়েছে আশ্রয়, খাবার ও তথ্য। জনগণের সমর্থন হারানোর অর্থ ছিল—যুদ্ধের নৈতিক ভিত্তি হারানো।
সাইগন: যখন পর্দা নামে
১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল সাইগনের পতন। ভিয়েতনামে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের ছাদে হেলিকপ্টার। চারিদিকে আতঙ্কিত মানুষ, তড়িঘড়ি করে দেশ ছাড়ার দৃশ্য—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক যুগের অবসান। এটি শুধু একটি শহরের পতন ছিল না; এটি ছিল একটি স্বীকারোক্তি। যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে—যুদ্ধ শুধু শক্তি দিয়ে জেতা যায় না। ভিয়েতনাম যুদ্ধ আজও শেখায়— শক্তি থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। ভূগোল, মানুষ ও সংস্কৃতি না বুঝলে আধুনিক অস্ত্রও ব্যর্থ হয়। জনগণের সমর্থন ছাড়া যে কোনো যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ইরান হোক, আফগানিস্তান হোক, কিংবা অন্য কোনো সংঘাত—ভিয়েতনামের জঙ্গল আজও ইতিহাসের ভেতর থেকে ফিসফিস করে বলে যায়: যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নয়, এটি বোঝাপড়ার লড়াই।
