নেত্রকোনায় আলিফ হত্যার ১৭ দিনেই খুলল খুনের জট

নেত্রকোনা প্রতিনিধি

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাবেক সেনাসদস্য আলিফ ফকির হত্যা মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ১৭ দিনের মাথায় তদন্তে বেরিয়ে এসেছে শুটার তাজুল ইসলামের নাম। গ্রেপ্তার দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও ঘটনার বিবরণ উঠে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া পাঁচজনের মধ্যে মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তাজুল।

রবিবার রাত ৭টা পর্যন্ত আদালতে দুই আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতে এসব তথ্য জানান দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে ছদ্মবেশে সীমান্তবর্তী দুই উপজেলার খবর সংগ্রহ করতেন আলিফ ফকির। সাজাপ্রাপ্ত আসামি, মাদক ও চোরাচালানসংক্রান্ত তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে দিতেন তিনি। এর ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের বেশি সময় সাজাপ্রাপ্ত তাজুল ইসলামকে ২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল গ্রেপ্তার করে তৎকালীন র‍্যাব। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে তাজুলের সঙ্গে আলিফের বিরোধ তৈরি হয়।

২০২৪ সাল থেকে সাংবাদিক পরিচয়ে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন আলিফ। পরে আইপি টিভি রূপালী বাংলার প্রতিনিধি পরিচয়ে সীমান্ত এলাকায় কাজ করতেন তিনি।

পুলিশ, গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া গ্রামে বাড়ির অদূরে গুলিবিদ্ধ হন আলিফ। পরে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরদিন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী অনিন্দিতা সামসার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আটজনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন পুলিশ অপূর্ব নামে এক যুবককে আটক করে। পরে ‘এসবিআর প্রাঙ্গণ’ নামের আরেক যুবককেও আটক করা হয়। সর্বশেষ শনিবার সুনামগঞ্জ জেলা থেকে আরও দুজনকে আটক করে ডিবি পুলিশ।

রোববার বিকেলে তাঁদের দুর্গাপুরে নিয়ে আসা হয়। আটক ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন (২৪) এবং সাব্বির আহমেদ (২৫) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। দুর্গাপুর চৌকি আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া তাঁদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে দুজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, তাজুল ইসলামের সঙ্গে আলিফের আগে থেকেই বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজুলের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন কাজ করার সময় সীমান্ত এলাকায় ব্যবসায় আলিফ বাধা দিতেন এবং পুলিশকে তথ্য দিতেন। এ কারণে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

হত্যাকাণ্ডে মোট পাঁচজন অংশ নেন। তাজুল পিস্তল দিয়ে আলিফকে গুলি করেন। তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান তাঁরা। তবে তদন্তের স্বার্থে এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ।

এদিকে, আলিফ হত্যার দিন রাতে দুজন ব্যক্তি তাঁকে অনুসরণ করছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী দোকানি রবিন রাংসা। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই শুটার তাজুলের সঙ্গে আলিফের বিরোধ এবং ওসির কাছে আলিফকে সতর্ক করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, নিহত আলিফ ফকিরের বিরুদ্ধেও কয়েকটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের একটি মামলা ছাড়া অন্য মামলাগুলো চোরাচালানসহ বিভিন্ন অভিযোগে দণ্ডবিধির ১৮৬০ সালের আইনে করা। এর মধ্যে ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর বারহাট্টা থানায়, ২০২৪ সালের ২১ মার্চ কলমাকান্দা থানায় এবং একই বছরের ৫ এপ্রিল আরেকটি মামলা হয়। তবে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তিনি অব্যাহতি পেয়েছিলেন।

অন্যদিকে, আলিফের মায়ের দাবি, সরকারি বুলেটে তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই নানা তথ্যের অসংগতি দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজন ও সচেতন ব্যক্তিরা। তাঁদের দাবি, পুলিশ যেন ঘটনার সঠিক তথ্য প্রকাশ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights