প্রকৃতি সংরক্ষণে আশার আলো দেখাচ্ছে বিজ্ঞানীরা
অনলাইন ডেস্ক
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ)-এর সাম্প্রতিক এক যুগান্তকারী রিপোর্টে বলা হয়েছে, বুনো বাঘ, টুনা মাছ এবং সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপের সফল সংরক্ষণ প্রমাণ করে যে বিশ্বে যে হারে প্রকৃতির ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, তা থামিয়ে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে এই ধারা বজায় রেখে বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্যের সম্পূর্ণ বিপর্যয় এড়াতে হলে মানবজাতিকে তাদের খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে একে পরবর্তী ইতিবাচক মোড়ে রূপান্তর করতে হবে।
ডব্লিউডব্লিউএফ-এর এই বিস্তৃত বিশ্লেষণে প্রায় ৩৬ হাজার প্রাণীর জনসংখ্যা এবং ৫ হাজারেরও বেশি প্রজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মেরুদণ্ডী বন্যপ্রাণীর ওপর গঠিত বিশ্বের বৃহত্তম ডেটাবেস। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৯৭০ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে ৭৩ শতাংশ কমেছে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক গতিতে প্রকৃতি প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছে এবং এই ক্ষতি হ্রাস পাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রকৃতির এই অবক্ষয় এখন আর কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা বা সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য সরাসরি হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বার্ষিক জিডিপির প্রায় অর্ধেক, যা ২০২৩ সালের হিসাবে প্রায় ৫৮ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৪৪ ট্রিলিয়ন পাউন্ডের সমতুল্য, সরাসরি প্রকৃতি এবং এর বাস্তুতন্ত্রের পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল। ডব্লিউডব্লিউএফ-এর গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে প্রজাতি বিলুপ্তির এই হার বর্তমানে অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব, ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং মানব কল্যাণের জন্য এক মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটের সৃষ্টি করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বন্যপ্রাণীর সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত এবং আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে। এর তুলনায় উত্তর গোলার্ধের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলগুলোতে পতনের এই প্রবণতা অনেকটাই ধীরগতির। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ১৯৭০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে স্থলভাগ ও স্বাদু পানির বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে অবিশ্বাস্য ৯৫ শতাংশ কমেছে। একইভাবে আফ্রিকার অঞ্চলে এই হ্রাসের হার ৮০ শতাংশ, অন্যদিকে ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় এই হ্রাসের পরিমাণ ২৩ শতাংশ।
বিশ্বের বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে স্বাদু পানির বন্যপ্রাণীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী ও হ্রদে বসবাসকারী পর্যবেক্ষণ করা বন্যপ্রাণী জনসংখ্যা গড়ে ৮৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর তুলনায় স্থলভাগের প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই হ্রাসের হার ৬৯ শতাংশ এবং সামুদ্রিক প্রজাতির ক্ষেত্রে তা ৫৯ শতাংশ।
ডব্লিউডব্লিউএফ ইউকে-এর প্রধান নির্বাহী তানিয়া স্টিল এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রকৃতির অবক্ষয় কেবল বন্যপ্রাণীদের জন্য এক সংকট নয়। এটি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, পানি সরবরাহ, সার্বিক অর্থনীতি এবং জলবায়ুজনিত আঘাত সহ্য করার ক্ষমতার ওপর তীব্র ঝুঁকি তৈরি করছে এবং ইতিমধ্যেই আমাদের এর মাশুল গুণতে হচ্ছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, আমরা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি: হয় আমাদের প্রকৃতির এই ধ্বংসের মাশুল প্রতিনিয়ত গুনে যেতে হবে, অথবা প্রকৃতির পুনরুজ্জীবন এবং এমন এক ভবিষ্যৎ গঠনে বিনিয়োগ করতে হবে যেখানে মানুষ ও বন্যপ্রাণী পাশাপাশি একসাথে সমৃদ্ধ হতে পারে।
তবে বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের এই সার্বিক নিরাশাজনক চিত্রের মধ্যেও বুনো বাঘ, সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং ব্লুফিন টুনা মাছের অভাবনীয় ফিরে আসা আশার আলো দেখাচ্ছে। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, এই সাফল্যগুলো প্রমাণ করে যে সঠিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে প্রকৃতির বিশ্বব্যাপী অবক্ষয়কে বিপরীতমুখী করা এখনো সম্পূর্ণ সম্ভব।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১০ সালে বিশ্বজুড়ে মাত্র ৩২০০টির মতো বুনো বাঘ অবশিষ্ট ছিল এবং প্রজাতিটি দ্রুত বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছিল। তবে পরবর্তীতে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপের ফলে বাঘের সংখ্যা ৭০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৫৭০০-তে পৌঁছেছে। ডব্লিউডব্লিউএফ ইউকে-এর টাইগার লিড বেকি ডে এই সাফল্যকে ‘আশার বিজ্ঞান’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, যখন জলবায়ু এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তখন ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যে সম্ভব; বুনো বাঘের এই ঘুরে দাঁড়ানো তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ।
প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয়েছে যে, কয়েক দশকের অতিরিক্ত মাছ শিকারের কারণে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ব্লুফিন টুনা মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল। কিন্তু বর্তমানে যথাযথ ব্যবস্থার কারণে তাদের সংখ্যা এমন এক পর্যায়ে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে যে প্রজাতি দুটিকে আর বিলুপ্তির হুমকিতে থাকা প্রাণীদের তালিকায় রাখা হচ্ছে না।
একইভাবে, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে প্রায় ৮০টি দেশে সমন্বিত সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ আইইউসিএন-এর লাল তালিকা বা রেড লিস্টে সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপকে প্রথমবারের মতো ‘বিপন্ন’ প্রজাতি থেকে ‘সর্বনিম্ন চিন্তার’ বা ঝুঁকিমুক্ত শ্রেণীতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটি সামুদ্রিক কচ্ছপের ইতিহাসে প্রথম এই ধরনের সাফল্য।
ডব্লিউডব্লিউএফ ইউকে-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা এবং প্রতিবেদনের সহ-লেখক ড. মাইক ব্যারেট মন্তব্য করেন, এই ইতিবাচক উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে প্রকৃতিকে একেবারে প্রান্তসীমায় ঠেলে দেওয়ার পরও তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব এবং এগুলো আমাদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। তবে একই সাথে এটাও স্পষ্ট যে শুধুমাত্র প্রথাগত সংরক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রকৃতির ওপর আসা এই বিশাল মাপের হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
তিনি সতর্ক করে দেন যে, জলবায়ু সংকটকে তরান্বিত করে এমন নেতিবাচক ও অপূরণীয় পরিবেশগত পরিবর্তন বা ‘নেগেটিভ টিপিং পয়েন্ট’গুলো পার হয়ে গেলে প্রকৃতির পুনরুজ্জীবনের আর কোনো সুযোগ থাকবে না। তাই যে ব্যবস্থাগুলো প্রকৃতির বিনাশ ঘটাচ্ছে, সেগুলোকে আমূল বদলে ফেলতে হবে, আর তা হলো জ্বালানি, খাদ্য এবং অর্থায়ন ব্যবস্থা। তিনি বলেন, তাদের রিপোর্ট দেখাচ্ছে যে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে জ্বালানি খাতে আমরা ইতিমধ্যেই ইতিবাচক টিপিং পয়েন্ট পার করে ফেলেছি। এই রূপান্তরটি এখন সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে; এটি হয়তো কাঙ্ক্ষিত গতিতে ঘটছে না, তবে রূপান্তরটি থামানো অসম্ভব।
একইভাবে মানবজাতিকে তাদের খাদ্য উৎপাদনের পদ্ধতিতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। কৃষিই হলো প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস ও অবক্ষয়ের একক বৃহত্তম কারণ এবং ফলস্বরূপ জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান চালিকাশক্তি। অধিকন্তু কৃষি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় তা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে এক ক্ষতিকর চক্র সৃষ্টি করে।
গ্লোবাল সিস্টেমস ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো এবং প্রতিবেদনের অন্যতম সহ-লেখক ড. স্টিভ স্মিথ বলেন, প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সফলতা আসতে পারে একটি টেকসই ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তবে দুঃখজনকভাবে বর্তমানে আমরা এই লক্ষ্য থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করছি। তিনি উল্লেখ করেন, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সারা বিশ্বে বন উজাড় বা বনাঞ্চল ধ্বংসের প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটে চলেছে কৃষিকাজের সম্প্রসারণের কারণে।
প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, ‘পজিটিভ টিপিং পয়েন্ট’ বা ইতিবাচক মোড় হলো এমন এক সূচক, যার পরে কোনো একটি টেকসই প্রযুক্তি বা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ক্রমশ সস্তা, ব্যাপক এবং রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যার ফলে সেই খাতের সার্বিক অগ্রগতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়িত হতে থাকে।
সূত্র: গার্ডিয়ান
