যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের মাথাব্যথা আরও বাড়ল

অনলাইন ডেস্ক
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হতে যাওয়া নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি এবং আমেরিকার ভোটাররা ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ভোট দেওয়া শুরু করেছেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে নিজের অন্যতম প্রধান সমস্যাগুলোর মোকাবেলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদেশমুখী হয়েছেন,বিশেষ করে রাশিয়ার দিকে।

তবে বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণ সহজে কোনো সমাধান দেয় না। রাজনৈতিক কোনো সুফল পাওয়ার আগেই জ্বালানি তেলের দাম কমাতে ট্রাম্প যে চেষ্টা করছেন, তা ভেস্তে দেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ।

উত্তেজনার শুরু শুক্রবার বিকেলে, যখন ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তির ঘোষণা দেন। যে চুক্তির আওতায় আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র শত শত কোটি টন ডিজেল পাবে রাশিয়া থেকে।

উচ্চ জ্বালানি মূল্য, বিশেষ করে মধ্যপশ্চিমাঞ্চলের কৃষিনির্ভর রাজ্যগুলোতে, যেখানে কৃষিযন্ত্র চালানো এবং বাজারে পণ্য পরিবহনের জন্য ডিজেল অপরিহার্য, তখন বিষয়টি মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনমত জরিপ বলছে, ভোটাররা ইরান যুদ্ধকেই তাদের এই দুর্দশার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন।

সার্বিকভাবে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন এবং ইরান যুদ্ধ ও মার্কিন অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে তার সফলতার মাত্রা বেশ দ্রুত নিচে নেমে গেছে।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে তার এই রুশ চুক্তিকে “আমেরিকানদের জন্য কম দামে জ্বালানি নিয়ে আসা” বলে ফলাও করে প্রচার করেন। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগকে এমন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার নির্দেশ দেন, যার কারণে বিশ্ববাজারে রুশ ডিজেল বিক্রি বন্ধ ছিল।

এর দুই দিন পর ট্রাম্প আবার তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফিরে আসেন এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি নতুন জ্বালানি যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে বড়াই করতে শুরু করেন।

তবে সত্যটা ছিল আরও জটিল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান যে, এই চুক্তির বিষয়ে তাকে আগে থেকে জানানো হয়নি, যদিও তিনি বলেছেন যে তার দেশ এটি মেনে চলবে।

অন্যদিকে রাশিয়া ছিল সম্পূর্ণ নীরব। আর রবিবার রাতে তারা ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর নতুন করে হামলা শুরু করে।

সোমবার জেলেনস্কি ব্যঙ্গাত্মক সুরে মন্তব্য করেন, “এটা স্পষ্ট যে পুতিন ট্রুথ সোশ্যাল পড়েন না।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই শীতে রাশিয়া যদি জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয়, তবে আমরাও জবাব দেব।”

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার এবং জেলেনস্কির সম্পর্ক অত্যন্ত অস্থিরতাপূর্ণ। হোয়াইট হাউসে ফেরার পর যে যুদ্ধ শেষ করা সহজ হবে বলে তিনি আগে দাবি করেছিলেন, সেই সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট একবার রাশিয়াকে এবং আরেকবার ইউক্রেনকে দোষারোপ করছেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জেলেনস্কিই ট্রাম্পের ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন, কারণ রুশ তেল অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ঘাটতিতে ভূমিকা রেখেছে।

শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প এও বলেন, ইউক্রেনের একজন নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় এসেছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এবং সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলেনস্কি রুশ শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনের অস্ত্র বিক্রি এবং গোয়েন্দা তথ্য লেনদেন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ট্রাম্প বলেছেন, জেলেনস্কিকে এবার ‘অবশ্যই এটা বন্ধ করতে হবে’।

স্বাধীন থিঙ্ক-ট্যাংক প্যানজিয়া পলিসির প্রতিষ্ঠাতা টেরি হেইনস বলেন, “আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘ এক দশকের একটি প্রকাশ্য রেকর্ড রয়েছে। যারা তার ইচ্ছা অনুযায়ী, যখন এবং যেভাবে তিনি চান সেভাবে কাজ করেন না, তাদের ওপর চড়াও হওয়ার।”

এখন মনে হচ্ছে, কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সেটি প্রচার করার ট্রাম্পের সেই পুরোনো স্বভাবের সঙ্গেই মিল রয়েছে তার এই “জ্বালানি যুদ্ধবিরতি” উদযাপনের। অতীতেও তিনি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতি বা বড় ধরনের শান্তি চুক্তিগুলো সময়ের আগেই ঘোষণা করে দিয়েছিলেন।

কূটনীতির ধীর গতির কারণে প্রেসিডেন্টের অধৈর্য কিংবা কোনো চুক্তিকে সফল করার একটি চতুর কৌশল—যাই হোক না কেন, এর ফলস্বরূপ এক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, কারণ বিশ্ববাসী এখন বুঝতে চাইছে এর অর্থ কী এবং কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত।

সেই প্রতিক্রিয়া আসতেও বেশি সময় লাগেনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রেসিডেন্টের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠা- কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, এই জ্বালানি যুদ্ধবিরতির প্রতি “দৃঢ় সমর্থন” জানিয়েছেন।

কিন্তু ডিজেল চুক্তিটি কঠোর নিন্দা করে বলেছেন যে, এটি ইউরোপে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করছে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার “অবৈধ, অহেতুক যুদ্ধকে” অর্থায়ন করতে সহায়তা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্পের এই ডিজেল ঘোষণা নিজ দলের সদস্যদের মধ্যেও একই রকম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। চারজন রিপাবলিকান সেনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মিলে প্রেসিডেন্টকে “অবিলম্বে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার” করার আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।

রবিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেনেটররা বলেছেন, “ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের নৃশংস যুদ্ধে মার্কিন ডলারের অর্থায়ন ঠেকাতে ২০২২ সালে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছিল কংগ্রেস। রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি সরাসরি সেই আইনের পরিপন্থী।”

প্রেসিডেন্টের জন্য এর চেয়েও বড় খারাপ খবর হতে পারে এই যে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও ডিজেলের দামে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতা থেকে কিছুটা নিচে থাকলেও এখনো প্রতি গ্যালন ছয় ডলারের বেশ ওপরেই রয়ে গেছে।

এদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সর্বশেষ নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সহিংসতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে আরও বেশি সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।সৌদি আরবের ওপর হুথি বিদ্রোহীদের নতুন হামলা— যার মধ্যে বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা ঘটনায় সপ্তাহান্তে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে- যা এক দশক ধরে চলে আসা সংঘাতকে আরও তীব্র করে তোলার হুমকি তৈরি করেছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, “হুথিরা এর মাধ্যমে বার্তা দিচ্ছে যে এটি কেবল সামরিক বা জ্বালানি অবকাঠামো নয়, তারা বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোতেও আঘাত হানবে যা অনেক মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।”

তিনি বলেন, অঞ্চলের কোনো আরব দেশই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধটি চায়নি, আর সাম্প্রতিক হুথি আক্রমণ ছিল তার একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মাঝে যেকোনো নতুন শত্রুতা আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে এবং তেলের দাম আরও আকাশচুম্বী করে তুলতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হওয়ার আগে, এটি আরও খারাপের দিকে যাবে বলেই আমার মনে হয়।”

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে ইউক্রেনকেই বিশ্বের জ্বালানি সংকটের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

তিনি ইরানের সামরিক হুমকির কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের ট্যাংকার চলাচল বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন।

তবে এটি একধরনের সান্ত্বনা বা আশাবাদী চিন্তা হতে পারে—মার্কিন জনগণের জ্বালানি নিয়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার একটি অপচেষ্টা।

যাতে তাদেরকে এমন এক চিন্তার দিকে সরিয়ে নেওয়া যায়, যা শুরু হয়েছিল অন্য এক প্রেসিডেন্টের আমলে।

তবে বাস্তবতা হলো, এক সময়ে একজনই প্রেসিডেন্ট থাকেন। আর মার্কিন ভোটাররা যখন ভোট দিতে যান, তখন তারা সাধারণত বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিকেই এর জন্য দায়ী করেন।

একটি কঠিন ও এলোমেলো সপ্তাহ শেষে আবারও প্রমাণিত হলো যে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সহজ কোনো সমাধান নেই, আর মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য এর চেয়ে খারাপ খবর আর কিছু হতে পারে না। সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights