শ্রীলঙ্কার সাবেক ফার্স্ট লেডি গ্রেফতার

অনলাইন ডেস্ক

শিশুদের হাসপাতালের জন্য সংগ্রহ করা অনুদানের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগে শ্রীলঙ্কার সাবেক ফার্স্ট লেডি শিরান্তি রাজাপাকসেকে গ্রেফতার করেছে দেশটির দুর্নীতিবিরোধী কর্তৃপক্ষ।

৭৩ বছর বয়সী শিরান্তি সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের স্ত্রী। বুধবার কলম্বোর নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তারা।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘সিরিলিয়া সাভিয়া’ নামের একটি দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করা প্রায় ১ কোটি শ্রীলঙ্কান রুপি। এই অর্থ কলম্বোর লেডি রিজওয়ে শিশু হাসপাতালের জন্য একটি বিশেষায়িত স্ক্যানার কেনার উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা হয়েছিল।

তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় স্ক্যানারটি এরই মধ্যে চীনা সরকার অনুদান হিসেবে দিয়ে দিয়েছিল। ফলে সংগ্রহ করা অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ অস্বীকার শিরান্তির
শিরান্তি রাজাপাকসে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ বা অন্য কোনওভাবে বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হয়নি।

সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের মুখপাত্র মনোজ গামাগেও বলেছেন, অর্থটি নিরাপদেই সিরিলিয়া সাভিয়ার ব্যাংক হিসাবে রয়েছে। সেখানে কোনও ধরনের জালিয়াতি বা অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করেছেন তিনি।

শিরান্তি সম্প্রতি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে ছিলেন। সোমবার তিনি শ্রীলঙ্কায় ফেরেন। দেশে ফেরার আগে তার পক্ষ থেকে গ্রেফতার ঠেকাতে আদালতে একটি আবেদন করা হয়েছিল। তবে সেই আবেদনের শুনানি আগামী ১২ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর আগেই তাকে গ্রেফতার করা হলো।

রাজাপাকসে পরিবারের বিরুদ্ধে ফের দুর্নীতির তদন্ত
শিরান্তির গ্রেফতারের ঘটনা শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে পরিবারের বিরুদ্ধে নতুন করে শুরু হওয়া দুর্নীতিবিরোধী তদন্তকে আরও আলোচনায় এনেছে।

মাহিন্দা রাজাপাকসে ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তার পরিবার দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।

মাহিন্দা রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, বিশেষ করে দেশটির প্রায় তিন দশকের গৃহযুদ্ধের অবসানের পর। ২০০৯ সালে তার প্রথম মেয়াদে তামিল বিদ্রোহী সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলাম (এলটিটিই) পরাজিত হলে দীর্ঘদিনের ওই সংঘাতের অবসান ঘটে। এ কারণে তার সমর্থকদের অনেকেই তাকে জাতীয় বীর হিসেবে অভিহিত করতেন।

তবে পরবর্তী সময়ে রাজাপাকসে পরিবারের শাসন নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকটের সময় পরিবারটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ব্যাপকভাবে সামনে আসে।

অর্থনৈতিক সংকটে পতন রাজাপাকসে সরকারের
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যায় এবং দেশটি জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটে পড়ে।

সেই সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাহিন্দার ছোট ভাই গোতাবায়া রাজাপাকসে। বিক্ষোভ ক্রমে তীব্র হয়ে উঠলে শেষ পর্যন্ত তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।

রাজাপাকসে পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাবও এরপর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের যেসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে তদন্তাধীন ছিল, সেগুলোর অনেকগুলো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল।

বর্তমান সরকারের সময়ে পুরোনো তদন্ত ফের সক্রিয়
বর্তমানে প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের নেতৃত্বাধীন সরকার রাজাপাকসে পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা দুর্নীতির তদন্তগুলো পুনরায় সক্রিয় করেছে।

এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর মাহিন্দা ও শিরান্তির বড় ছেলে নামাল রাজাপাকসেকেও গ্রেফতার করা হয়। তার বাবার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় করা একটি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে তার গ্রেফতারের সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে তিনি রিমান্ডে রয়েছেন।

নামালের ভাই ইয়োশিথা রাজাপাকসেকেও চলতি বছরের শুরুতে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

শিরান্তি রাজাপাকসের বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগ ও গ্রেফতার তাই রাজাপাকসে পরিবারের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতিবিরোধী তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে শিশু হাসপাতালের জন্য সংগ্রহ করা ১ কোটি রুপির অর্থ আত্মসাৎ বা অপব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। শিরান্তি ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights