সংকটে মুমিনের করণীয়

নূর মুহাম্মদ রাহমানী

জীবনজীবনমান উন্নত হওয়ার কামনা সবার। সবাই চায় একটু ভালো থাকতে। কষ্ট, দারিদ্র্য, সংকট কেউ চায় না। কিন্তু মানুষ যা চায় সবই কি পায়? অনেককেই পেয়ে বসে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও আর্থিক টানাপোড়েন। এসবে পড়ে মানুষ অনেক সময় হতাশার সাগরে হাবুডুবু খায়। আল্লাহ থেকে আরও দূরে সরে যায়। অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়। এজন্য ইসলাম একজন মুমিনের আকিদা, চরিত্র, সাংসারিক জীবন এবং সামাজিক জীবন যাতে সংকটাপন্ন না হয়ে পড়ে এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এখানে কিছু নির্দেশনা তুলে ধরা হলো।

বিনম্র নামাজ : যেকোনো সংকটে নামাজের চেয়ে উত্তম আমল হতে পারে না। বিপদে পড়লে আমরা কত ধরনের আমলের সন্ধান করি; তবে সবচেয়ে উত্তম হলো নামাজের মাধ্যমে সমাধান চাওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘আর ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য গ্রহণ কর। নিশ্চয়ই নামাজ বড় কঠিন, তবে বিনয়ীদের নিকট (কঠিন) নয়।’ (সুরা বাকারা : আয়াত-৪৫)।

ইস্তেগফার : ইস্তেগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা অনেক বড় আমল। এর দ্বারা সচ্ছলতা আসে এবং সংকট কাটে। আল্লাহর নবী হুদ (আ.) স্বীয় জাতিকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘আর হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আপন রবের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর অভিমুখী হয়ে যাও। তিনি তোমাদের ওপর আসমান থেকে মুষলধারে (বৃষ্টি) বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির সঙ্গে আরও শক্তি বাড়িয়ে দেবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।’ (সুরা হুদ : আয়াত-৫২)।

পরিকল্পনা গ্রহণ : পরিকল্পনামাফিক কাজ করলে সংকট কাটিয়ে ওঠা সহজ। মিসরের বাদশাহ রাইয়ান ইবনে ওলিদ স্বপ্নে দেখেন-‘সাতটি মোটাতাজা গাভি-ওদের খেয়ে ফেলছে সাতটি শীর্ণ গাভি এবং সাতটি সবুজ শিষ ও আরও সাতটি শুষ্ক শিষ।’ স্বপ্নের ব্যাখ্যায় নবী ইউসুফ (আ.) বুঝতে পারলেন-আগামী সাত বছর দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। তাই বাদশাহকে তিনি পরিকল্পনা দিলেন যাতে সে দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে ওঠা যায়। পরিকল্পনা দেওয়ার বিষয়টির উল্লেখ করতে গিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে-‘তিনি (ইউসুফ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তোমরা লাগাতার সাত বছর চাষাবাদ করবে। অতঃপর যে শস্য তোমরা কাটবে, তা শিষসহ রেখে দেবে, তবে সামান্য পরিমাণ ছাড়া, যা তোমরা খাবে। এরপর আসবে কঠিন সাতটি বছর, যা এ সাত বছরের জন্য তোমরা যে (ফসল) সঞ্চয় করে রেখেছিলে তা খেয়ে ফেলবে, তবে সামান্য পরিমাণ ছাড়া, যা তোমরা (বীজের জন্য) সংরক্ষণ করবে।’ (সুরা ইউসুফ : আয়াত-৪৭-৪৮)।

সম্পদ সঞ্চয় : শরিয়তসম্মতভাবে সম্পদের প্রয়োজনীয় হক আদায় করে সম্পদ সঞ্চয় করা এবং উত্তরাধিকারীদের জন্য কিছু সম্পদ রেখে যাওয়া উত্তম। ‘সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর অন্তিম শয্যায় রসুল (সা.) তাঁকে দেখতে যান এবং বলেন, তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের অসহায় হয়ে মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে স্বাবলম্বী করে রেখে যাওয়া উত্তম।’ (সহিহ বুখারি : হাদিস-১২৯৫)।

সম্পদ সংরক্ষণ : সম্পদের সুসম বণ্টন নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এটা ছাড়া সম্পদ সংরক্ষণ হবে না এবং বড় ধরনের সংকট কাটানো যাবে না। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে যে সম্পদ তাঁর রসুলকে দিলেন, তা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের এবং আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের জন্য, যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তন না করে।’ (সুরা হাশর : আয়াত-৭)।

ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন : চিন্তাভাবনা করে যথাস্থানে ব্যয় করা মুমিনের কর্তব্য। যত্রতত্র খুব বেশি খরচ করা, আবার প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পকেট থেকে পয়সা বের হতেই না চাওয়া-উভয়টাই আপত্তিকর। আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি তোমার হাত নিজ ঘাড়ের সঙ্গে বেঁধে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্তও করে দিয়ো না।’ (সুরা ইসরা : আয়াত-২৯)।

মজুতদারি রোধ : সংকট থেকে মুক্তির জন্য যেকোনোভাবে মজুতদারি ঠেকাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যক্তিদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। ইসলামের দৃষ্টিতেও তা ভয়াবহ অপরাধ। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমদানিকারী রিজিকপ্রাপ্ত এবং মজুতকারী অভিশপ্ত।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদিস-২১৫৩)।

লেখক : শিক্ষা সচিব ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights