স্যালাইনের তীব্র সংকট

জয়শ্রী ভাদুড়ী

হাম-ডেঙ্গুর তাণ্ডবে সারা দেশের হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড়। রোগীদের চিকিৎসায় অতি প্রয়োজনীয় সাধারণ ইন্ট্রাভেনাস (আইভি) স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। বর্তমানে প্রতি মাসে স্যালাইনের চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) সক্ষমতা মাত্র ৩-৪ লাখ ব্যাগ উৎপাদনের। মূল্য সমন্বয় না করায় লোকসান ঠেকাতে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। ফলে সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালের শয্যায় রোগী রেখে তরল স্যালাইন বা সোডিয়াম ক্লোরাইড কিনতে এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে ছুটতে হচ্ছে স্বজনদের।

ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রায় ২০ দিন ধরে বিভিন্ন কোম্পানি নিয়মিত স্যালাইন সরবরাহ করতে পারছে না। এদিকে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় স্যালাইনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে অবস্থিত মেডিকেয়ার ফার্মেসির কর্মী ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তরল স্যালাইন কিনতে আসছে, কিন্তু আমরা দিতে পারছি না। ওরিয়ন, পপুলার, বেক্সিমকোসহ অন্য কোম্পানিগুলোর সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে। প্রেসক্রিপশন নিয়ে মানুষ স্যালাইনের জন্য এসে ফিরে যাচ্ছে।’ বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক পরিচালক জাকির হোসেন রনি বলেন, ‘বেসরকারি যেসব কোম্পানি থেকে আমরা স্যালাইন সংগ্রহ করি তারা উৎপাদন অনেক কমিয়ে দিয়েছে। জানতে পেরেছি উৎপাদন খরচ বাড়লেও সরকার মূল্য সমন্বয় না করায় ক্ষতিতে উৎপাদন করতে চাইছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। এদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়ে যাওয়ায় স্যালাইনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এ টানাপোড়েনে বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ।’ মালিবাগের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজন শাকিল হোসেন বলেন, ‘মালিবাগ, মগবাজার, ইস্কাটনের প্রায় ৩০টি ফার্মেসি খুঁজে এক ব্যাগ স্যালাইন জোগাড় করতে পারিনি। অবশেষে শাহবাগের এক ফার্মেসি থেকে দ্বিগুণ দামে কিনেছি। ফার্মেসির কর্মীরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি ব্যাগ স্যালাইন প্রায় ৮০-৮৭ টাকায় বিক্রি করেন তাঁরা।’

সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতায় ঘাটতি : আইভি স্যালাইন প্রস্তুতকারকদের হিসাব অনুযায়ী, ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপের কারণে স্যালাইনের মাসিক চাহিদা ৪০-৪৫ লাখ ব্যাগ থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৮০-৯০ লাখ ব্যাগে দাঁড়িয়েছে। ইডিসিএল তরল স্যালাইন উৎপাদন করে। জানা যায়, ইডিসিএলের মাসিক উৎপাদন মাত্র ৩-৪ লাখ ব্যাগ; যেখানে জাতীয় পর্যায়ের চাহিদা স্বাভাবিক সময়েই প্রায় ৫০ লাখ ব্যাগের কাছাকাছি। ফলে সরকারি উৎপাদন দিয়ে বাজারের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব নয়। গুরুতর অসুস্থ যেসব রোগী পর্যাপ্ত পানি পান করতে পারে না, তাদের পানিশূন্যতা রোধ করতে এবং শরীরে তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে আইভি স্যালাইন দিতে হয়। কিছু ডেঙ্গুরোগীর জন্য জরুরি হলেও সবার ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন হয় না।’

মূল্য সমন্বয় না করায় উৎপাদন কমিয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান : বেসরকারি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বলছে, ২০১৫ সালের পর থেকে তরল স্যালাইনের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য আর বাড়ানো হয়নি। কিন্তু আমদানি কাঁচামাল, প্যাকেজিং, ডলারের মূল্য ও অন্যান্য উপকরণের মূল্য এখন অনেক বেশি। তারা বলছে, সরকার-নির্ধারিত ৮৭ টাকার বিপরীতে বর্তমানে প্রতি ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১২০ টাকা। ওরিয়ন ইনফিউশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রায় তিন মাস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে মূল্য সংশোধনের প্রস্তাব আটকে আছে। আগে আমরা প্রতি মাসে ১০ লাখ ব্যাগ উৎপাদন করতাম, এখন ৪-৫ লাখ ব্যাগ উৎপাদন করছি। আইভি স্যালাইনের ক্ষেত্রে শুধু পানি বাদে বাকি সব উপাদান আমদানি করতে হয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু স্যালাইনের মূল্য সেই ২০১৫ সালের তালিকা অনুযায়ী আছে। দেশে প্রায় ২৫০টি ওষুধ কোম্পানি থাকলেও ইনফিউশন কোম্পানি মাত্র ছয়টি।’

জানা যায়, ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে স্যালাইনের চাহিদা বাড়লেও দামের এ জটিলতার জন্য কোম্পানিগুলো উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে না। লোকসান বাড়তে থাকায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছে। দেশের একসময়কার সবচেয়ে বড় স্যালাইন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান লিবরা ইনফিউশনস তাদের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস স্যালাইন উৎপাদন স্থগিত রেখেছে। বেক্সিমকোও কিছু উৎপাদন বন্ধ করেছে। অপসোনিন, ওএসএল ফার্মা, এসেনশিয়াল ড্রাগস ও পপুলার ফার্মাও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

স্যালাইন উৎপাদনে ফিরতে চায় আইপিএইচ : দেশে সরকারিভাবে স্যালাইন উৎপাদন হতো রাজধানীর মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (আইপিএইচ)। প্রতিদিন গড়ে ৮ হাজার ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদন করা হতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শর্ত পূরণ করতে না পারায় ২০২০ সালে বন্ধ হয়ে যায় স্যালাইন উৎপাদন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি আঞ্চলিক কেন্দ্রেও উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘লিকুইড স্যালাইন বা ইনফিউশন উৎপাদনের আইপিএইচের আগের অবকাঠামোটি ব্যবহার করে আবার উৎপাদনে যেতে কিছু সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য ইতোমধ্যে ডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকার যদি বিদ্যমান কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়, তাহলে সংস্কার করে এক বছরের মধ্যে উৎপাদনে যেতে পারব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights