হঠাৎ করেই বেড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রফতানি, প্রতিদিন যাচ্ছে ২২.৫ মিলিয়ন ব্যারেল

অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি সত্ত্বেও অঞ্চলটি থেকে অপরিশোধিত তেল রফতানির পরিমাণ যুদ্ধপূর্ব সময়কেও ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক শিপ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর প্রাথমিক তথ্যের বরাতে আজ এই চিত্র সামনে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে অন্তত চার দিনই মধ্যপ্রাচ্যের তেল রফতানি যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক মাত্রাকে অতিক্রম করেছে। মূলত হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর, বিভিন্ন উপকূলীয় টার্মিনাল এবং ওমান সাগরে জাহাজ থেকে জাহাজে জ্বালানি হস্তান্তরের মাধ্যমেই এই বিপুল পরিমাণ তেল সররাহ করা হচ্ছে।

কেপলারের উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গেল ২৪ সেপ্টেম্বর এবং ২৭ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী সময়ে এই অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৯.৫ থেকে ২২.৫ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি হয়েছে। যেখানে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত শুরুর আগে অর্থাৎ ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গড়ে প্রতিদিন ১৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রফতানি হতো। এছাড়া অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি, রাসায়নিক দ্রব্য এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসসহ সামগ্রিক জ্বালানি রফতানির পরিমাণ ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন ২২.৪ মিলিয়ন ব্যারেলে গিয়ে পৌঁছায়। অক্টোবরের ১ তারিখেও এই সাত দিনের গড় রফতানি দাঁড়িয়েছিল প্রতিদিন ১৮.৫ মিলিয়ন ব্যারেলে।

এমনকি সেপ্টেম্বর মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল গত ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। উল্লেখ্য, রাডার বা নজরদারি এড়াতে যেসব জাহাজ নিজেদের স্বয়ংক্রিয় আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ট্রানসপন্ডার বন্ধ রেখে প্রণালী পার হয়েছে, সেগুলো এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

তবে রফতানি বৃদ্ধির এই উপাত্ত সামনে এলেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের মূল চিত্র নিয়ে বিপরীতমুখী দাবি করেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর আইআরজিসি। সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার আলিরেজা ফাদাভি এক সাম্প্রতিক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, বর্তমানে মার্কিন নজরদারিতে বা তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা রুট দিয়ে দৈনিক মাত্র ৩০ থেকে ৪০ লাখ বা ৩ থেকে ৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হচ্ছে, যা যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক চলাচলের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। তিনি আরও দাবি করেন, পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি, ওমান সাগর কিংবা ভারত মহাসাগরের উত্তরাঞ্চলেও বর্তমানে কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি নেই এবং আইআরজিসির সম্ভাব্য আক্রমণের মুখে মার্কিন নৌশক্তি পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মূলত ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন সামরিক জাহাজে হামলার দাবির পরপরই ওয়াশিংটন তাদের নৌশক্তিকে ইরানি উপকূল থেকে দূরবর্তী স্থানে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বলে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালি ও এডেন উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট এখনও কাটেনি। যুক্তরাজ্য সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থার তথ্যমতে, গত ২ অক্টোবর থেকে প্রতিদিন অন্তত একটি করে হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। আঞ্চলিক এই অস্থিতিশীলতার মাঝেই ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ সমন্বয়ক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘোষিত সাত দিনের শর্তাবলী ও পরিকল্পনা মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধই থাকবে। রফতানি উপাত্তের সাময়িক ঊর্ধ্বগতি থাকলেও প্রণালী বন্ধের এই রাজনৈতিক ঘোষণা এবং অব্যাহত সামরিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বহাল রয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights