ওষুধে মশা মরছে না যে কারণে
জয়শ্রী ভাদুড়ী
মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরজীবন। গত বছর এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪১৩ জন। এডিসের প্রকোপ কমতেই শুরু হয়েছে কিউলেক্স মশার অত্যাচার। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশক নিধনে বিভিন্ন কর্মসূচি নিলেও তা কাজে আসছে না। মশার অবস্থান চিহ্নিত না করে ওষুধ ছিটানোয় কাজে আসছে না বলে জানিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের তথ্য বলছে, ঢাকায় সংগৃহীত মোট প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো পরিসংখ্যানগত কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নালা, জলাবদ্ধ বেসমেন্ট ও পার্কিং এলাকা-সব মিলিয়ে ঢাকা শহর নিজেই যেন কিউলেক্স মশার জন্য এক আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই মশা নিয়ন্ত্রণে খালবিলে স্প্রে করা হয়। কিন্তু খালগুলো কচুরিপানায় ভর্তি। ওষুধ ছিটানো হয় এসব কচুরিপানার ওপরে। ফলে ওষুধে মরে না মশা।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ এডিস মশার জন্ম হয় তিন জায়গায়। নির্মাণাধীন ভবনের পানি জমে থাকা মেঝেতে ৪৭ শতাংশ, বাড়ির নিচতলায় ১৭ শতাংশ এবং প্লাস্টিকের ড্রামে ১৫ শতাংশ এডিসের লার্ভা পাওয়া যায়। এ জায়গাগুলো নির্দিষ্ট করে মশার ওষুধ ছিটাতে হবে। এটাকে বলা হয় টার্গেট স্পেসিফিক মসকুইটো কন্ট্রোল। এডিস ও কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে আলাদা ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিকল্পনা করে কাজ করলে মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চ মাসে কিউলেক্স মশার কামড়ে রাজধানীবাসী অতিষ্ঠ হয়ে যাবে। কিউলেক্স মশা সাধারণত ‘রোগ ছড়ায় না’-এই ভুল ধারণার কারণে সমস্যাটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। অথচ এই মশাই ফাইলেরিয়া রোগের বাহক।
মহাখালী আমতলী কাঁচাবাজারের দোকানি ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘সকালে দোকান খোলা থেকে রাতে বন্ধ করা পর্যন্ত শরীরে মনে হয় ১ হাজার মশা কামড়েছে। মশার অত্যাচারে পায়ে মোজা পরে থাকি। কিন্তু হাতে, মুখে কামড়ে লাল গুটিগুটি করে দিয়েছে। কয়েল, ইলেকট্রিক ব্যাট কিছুতেই বাগে আসছে না মশা। দোকানে তো আর মশারি দিয়ে বসে থাকতে পারি না।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বলেন, ‘এডিস এবং কিউলেক্স মশার উপদ্রব কমাতে নিয়মিত কার্যক্রম চলমান আছে। দুই প্রজাতির মশার বাসস্থান আলাদা। এজন্য মশক নিধনের পরিকল্পনাও ভিন্ন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ বাসস্থান ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং সচেতন হতে হবে। আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি, তবে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়।’
ডিএনসিসির সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. সাদমান সাকিব বলেন, ‘এডিস মশার প্রকোপ কমলেও কিউলেক্স মশা বেড়েছে। গত বছর এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসি থেকে ১ হাজার ২ শ স্কুলে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে বেশকিছু কাজ করা হয়েছে। এখন কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে মাসব্যাপী ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছে। আমরা ওয়ার্ডভিত্তিক ওষুধ ছিটানো ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত কাজ করছি।’
